গুজরাটে ২২ শিশুর মৃত্যু। খবরটা শুনে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কী ভাবার আছে? উত্তর একটাই— অনেক কিছু। কারণ, চণ্ডীপুরা ভাইরাস কোনও রাজ্যের সীমানা মেনে ছড়ায় না। বর্ষা এলেই বেলেমাছির সংখ্যা বাড়ে, আর সেই সঙ্গে বাড়ে এই বিরল কিন্তু প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণের আশঙ্কাও। বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিম ও মধ্য ভারতে এর প্রকোপ বেশি হলেও জলবায়ুর পরিবর্তন, মানুষের চলাচল এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে সংক্রামক রোগের বিস্তারের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। তাই গুজরাটের এই ঘটনা গোটা দেশের জন্যই এক বড় সতর্কবার্তা।
গুজরাট সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বর্ষায় এখনও পর্যন্ত অন্তত ২২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে চণ্ডীপুরা ভাইরাসের সংক্রমণে। সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ১৮৪। আক্রান্তদের প্রত্যেকেরই বয়স ১৫ বছরের কম। সাতজন এখনও আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি। আরও ১১ জনের পরীক্ষার রিপোর্ট আসা বাকি। এই পরিসংখ্যান শুধু একটি রাজ্যের স্বাস্থ্য-সংকটের ছবি নয়। এটি মনে করিয়ে দিচ্ছে, বর্ষাকালে ভাইরাসবাহিত রোগ কত দ্রুত প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে।
কেন বাংলার মানুষও সতর্ক থাকবেন?
পশ্চিমবঙ্গে এখনও বড় আকারে চণ্ডীপুরা ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা না গেলেও বর্ষায় মশা, বেলেমাছি ও অন্যান্য পতঙ্গের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। গ্রামীণ এলাকায় কাঁচা বাড়ি, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, জমে থাকা আবর্জনা এবং অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন থাকলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে 'কোথায় শুরু হয়েছে'-র চেয়ে 'কীভাবে ছড়ায়'— এই প্রশ্নটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড-১৯ থেকে নিপা, জিকা বা ইবোলা— সাম্প্রতিক ইতিহাস দেখিয়েছে, এক রাজ্য বা এক দেশের সংক্রমণ খুব দ্রুত অন্যত্রও পৌঁছে যেতে পারে।
কী এই চণ্ডীপুরা ভাইরাস?
চণ্ডীপুরা ভাইরাস প্রথম ধরা পড়ে ১৯৬৫ সালে মহারাষ্ট্রের নাগপুর জেলার চণ্ডীপুরা গ্রামে। এটি একটি পতঙ্গবাহিত ভাইরাস, যা মূলত বেলেমাছি (Sandfly)-র মাধ্যমে ছড়ায়। বর্ষাকালে এই পতঙ্গের বংশবৃদ্ধি দ্রুত হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, এই ভাইরাস শিশুদের মস্তিষ্কে দ্রুত আঘাত হানতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে তীব্র এনসেফালাইটিস তৈরি হয় এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রোগীর অবস্থার অবনতি হতে পারে।
কোন লক্ষণ দেখলেই সতর্ক হবেন?
প্রথম দিকে সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা যায়— হঠাৎ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, বমি, খিঁচুনি, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া৷ চিকিৎসকদের মতে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলিকে কখনও হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
এখনও নেই ওষুধ বা ভ্যাকসিন
চণ্ডীপুরা ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনও কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ বা অনুমোদিত ভ্যাকসিন নেই। তাই দ্রুত রোগ নির্ণয়, আইসিইউ-ভিত্তিক চিকিৎসা এবং উপসর্গ নিয়ন্ত্রণই একমাত্র ভরসা। এই কারণেই গুজরাট সরকার সব হাসপাতালকে নির্দেশ দিয়েছে, সন্দেহভাজন রোগীদের দ্রুত অক্সিজেন ও ভেন্টিলেশন-সুবিধাযুক্ত আইসিইউ-তে ভর্তি করতে হবে।
কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন?
চিকিৎসকদের পরামর্শ—শিশুদের পূর্ণহাতা জামা পরান। বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখুন। বেলেমাছি ও মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক ব্যবহার করুন। রাতে মশারি ব্যবহার করুন। জ্বর বা খিঁচুনি দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যান।
গুজরাটের ঘটনা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হল সচেতনতা। তাই গুজরাটে যা ঘটছে, তাকে শুধুই একটি রাজ্যের সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, ভাইরাস কখনও রাজ্যের সীমানা মানে না। বর্ষার এই সময়ে দেশের যে কোনও রাজ্যেই সতর্কতা বাড়ানো জরুরি। আজ গুজরাটে যে সতর্কবার্তা মিলেছে, তা আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গ-সহ গোটা দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।




