নিউজ ডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যে তীব্র জ্বালানি সংকট ভারতের দৈনন্দিন রান্নাঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালীর জলসীমা দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে জাহাজ চলাচলের নতুন কৌশল কাজে লাগিয়ে গত দু’মাসে ভারতমুখী এলপিজি রফতানি একলাফে অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলি। পণ্য ট্র্যাকিং সংস্থা কেপলার-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত ও কাতার থেকে ভারতের জ্বালানি আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত শুরুর পর থেকেই কার্যত থমকে গিয়েছিল হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহণ।
গৃহস্থালির প্রায় ৩০ কোটি সংযোগ সুরক্ষিত রাখতে বাণিজ্য ও শিল্পক্ষেত্রে জ্বালানি রেশনিং করতে হয়েছিল কেন্দ্রকে, বাড়ানো হয়েছিল সিলিন্ডার বুকিংয়ের দিনের ব্যবধানও। এক ধাক্কায় গত মার্চে দেশের মোট এলপিজি আমদানি ২০ লক্ষ টন থেকে নেমে এসেছিল ১১ লক্ষ টনে।
তবে সেই অচলাবস্থা কাটাতে উপসাগরীয় রফতানিকারকরা এখন বড় ভরসা করছেন ‘শিপ-টু-শিপ’ বা মাঝসমুদ্রে জাহাজ বদলের কৌশলের ওপর। হরমুজ প্রণালীর বিপজ্জনক জলসীমা পার করাতে ‘শাটল ট্যাঙ্কার’ ব্যবহার করা হচ্ছে, যেগুলির অবস্থান সংক্রান্ত ট্র্যাকার অনেক সময় বন্ধ রাখা হচ্ছে নজরদারি এড়াতে। ওমান উপকূল বা ভারতের পশ্চিম উপকূল সংলগ্ন নিরাপদ জলসীমায় এনে সেই জ্বালানি অন্য জাহাজে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
এই কৌশলের হাত ধরে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে আমিরশাহি থেকে ভারতের এলপিজি আমদানি মার্চ-আগস্টের গড়ের তুলনায় প্রায় ২৪০ শতাংশ বেড়ে মাসে গড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.৬৫ লক্ষ টনে। একইভাবে কুয়েত থেকে আমদানি বেড়েছে ২৪৮ শতাংশ এবং কাতারের সরবরাহ দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে ১.৪৭ লক্ষ টনে। তবে সৌদি আরব থেকে গত চার মাস ধরে কোনও আমদানি হয়নি।
সংকটের তুঙ্গে থাকা সময়ে ভারতের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছিল আমেরিকা। মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে ভারতের সিংহভাগ চাহিদা মেটায় মার্কিন কার্গো। কিন্তু ভৌগোলিক দূরত্ব এবং অতিরিক্ত খরচের কারণে উপসাগরীয় পথ খুলতেই মার্কিন নির্ভরতা ফের কমেছে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে আমেরিকা থেকে আমদানি প্রায় ৩৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে গড়ে ৪.১৮ লক্ষ টনে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আমদানি বৃদ্ধি দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির প্রমাণ নয়, বরং সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত। বর্তমানে মোট আমদানি পৌঁছছে প্রায় ১৫ লক্ষ টনে, যা যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় কিছুটা কম হলেও সংকট অনেকটাই প্রশমিত করেছে। দেশীয় শোধনাগারগুলি নিজস্ব উৎপাদন বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল। তবে সামনেই শীতকাল, আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন গ্যাসের দাম ও প্রতিযোগিতা বাড়বে। ফলে হরমুজ শান্ত থাকলে এবং উপসাগরীয় সরবরাহ সচল থাকলে ভারতীয় ক্রেতাদের জন্য জ্বালানি যেমন সহজলভ্য থাকবে, তেমনই দামও নাগালের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে।




