মুম্বই: পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল ছাত্রের বিরুদ্ধে। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হস্টেলের ঘরে মৃত্যু। প্রথমে ঘটনাটি ঘিরে তৈরি হয়েছিল একরকম প্রশ্ন। কিন্তু মৃত ছাত্রের পরিবারের অভিযোগের পর তদন্তের অভিমুখ বদলেছে। IIT Bombay-র দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সাহিল ওয়াকোড়ের মৃত্যুর ঘটনায় এক অধ্যাপকের বিরুদ্ধে জাতিবিদ্বেষমূলক মন্তব্য, মানসিক হেনস্থা এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে অধ্যাপক সূর্যনারায়ণন ডুল্লার বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। তদন্তভার দেওয়া হয়েছে মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চকে।
২০ বছরের সাহিল ইয়বতমাল থেকে IIT Bombay-তে পড়তে এসেছিলেন। এনার্জি সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। শুক্রবার একটি পরীক্ষায় তাঁর কাছে মোবাইল ফোন পাওয়া যায় বলে IIT Bombay জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের দাবি, পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ছবি তুলে ChatGPT-তে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন সাহিল। তবে এই ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেই জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পরীক্ষার পর শিক্ষক এবং বিভাগীয় প্রধান তাঁর সঙ্গে কথা বলেন, তাঁকে কাউন্সেলিং করা হয় এবং এই ঘটনার জন্য তাঁর শিক্ষাজীবনে কোনও প্রভাব পড়বে না বলেও আশ্বস্ত করা হয়েছিল বলে IIT Bombay-এর বক্তব্য। এর পরেই হস্টেলের ঘরে ফিরে যান সাহিল। সন্ধ্যায় তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
কিন্তু ছেলের মৃত্যুর পর অন্য অভিযোগ সামনে আনেন সাহিলের বাবা রবীন্দ্র চক্রধর ওয়ানখাড়ে। তাঁর দাবি, দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় গত প্রায় তিন মাস ধরে সাহিল মানসিক হেনস্থার শিকার হচ্ছিলেন। অভিযোগের আঙুল অধ্যাপক সূর্যনারায়ণন ডুল্লার দিকে। বাবার দাবি, জাতিগত পরিচয় নিয়ে সাহিলকে কটূক্তি করা হত এবং তাঁকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগে IIT Bombay-এর ডিরেক্টর শিরীষ বি. কেদারের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবারের দাবি, ডুল্লা নাকি ডিরেক্টরের নির্দেশেই এমন আচরণ করতেন। এগুলি অবশ্য পরিবারের অভিযোগ, তদন্তে যার সত্যতা যাচাই করা হবে।
এই অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশের FIR-এ অধ্যাপক ডুল্লাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আরও দু’জনের নাম এখনও অজ্ঞাত বলে উল্লেখ রয়েছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার আত্মহত্যায় প্ররোচনা এবং যৌথ দায় সংক্রান্ত ধারার পাশাপাশি তফসিলি জাতি ও উপজাতি (অত্যাচার প্রতিরোধ) আইনের ধারাও প্রয়োগ করা হয়েছে। শনিবার রাতেই তদন্তভার মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের হাতে যায়।
ঘটনাটি নিয়ে IIT Bombay-এর বক্তব্য অবশ্য পরিবারের অভিযোগের সঙ্গে মেলে না। প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর শিরীষ কেদারে জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের জাতিগত পরিচয় সংক্রান্ত তথ্যও সাধারণ ভাবে শিক্ষকদের নাগালের মধ্যে থাকে না। IIT Bombay-র তরফে আরও বলা হয়েছে, পরীক্ষার ঘটনায় সাহিলের বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ শুরু হয়নি এবং তাঁকে ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন নিয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। তদন্তে পুলিশকে পূর্ণ সহযোগিতা করা হবে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে পড়ুয়াদের একাংশের বক্তব্য, পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের পর সাহিলকে সাসপেন্ড করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এই দাবির সঙ্গে IIT Bombay-এর বক্তব্যের পার্থক্য রয়েছে। ফলে পরীক্ষার হল থেকে বেরোনোর পর সাহিলের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল, কার সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল এবং তার পরের কয়েক ঘণ্টায় কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল—তদন্তে সেই সময়টিই এখন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
সাহিলের পরিবার আরও জানিয়েছে, মৃত্যুর আগের রাতেও তাঁর সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবে কথা হয়েছিল। তাঁর মা সোনালির দাবি, ছেলের কথাবার্তায় কোনও অস্বাভাবিকতা তাঁরা বুঝতে পারেননি। পরিবারের বক্তব্য, পড়াশোনায় সাহিল ভাল ছিলেন এবং ভবিষ্যতে সিভিল সার্ভিসে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যাডমিন্টন ও স্কেটিংয়ের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
ছাত্রের মৃত্যুর পর IIT Bombay ক্যাম্পাসে পড়ুয়াদের মধ্যে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। তাঁরা ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত এবং দায় নির্ধারণের দাবি তুলেছেন। একই সঙ্গে পরিবারের অভিযোগের তদন্ত এবং প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য—দুই দিকই খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
এই মৃত্যু IIT Bombay-র ক্যাম্পাসে চলতি বছরে তৃতীয় পড়ুয়া-আত্মহত্যার ঘটনা বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সাহিলের মৃত্যুর পাশাপাশি ক্যাম্পাসে পড়ুয়াদের নিরাপত্তা, মানসিক চাপ এবং অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এখন ক্রাইম ব্রাঞ্চের তদন্তেই স্পষ্ট হওয়ার কথা—সাহিলের মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল, পরিবারের তোলা জাতিগত হেনস্থার অভিযোগের কোনও প্রমাণ রয়েছে কি না এবং পরীক্ষার ঘটনার সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনও প্রত্যক্ষ যোগ ছিল কি না। আপাতত কোনও পক্ষের অভিযোগকেই চূড়ান্ত সত্য ধরে নিচ্ছে না তদন্তকারী সংস্থা।