নয়াদিল্লি: এক দিন আগেই নির্বাচন কমিশনের দফতরে যাওয়াকে কেন্দ্র করে ধস্তাধস্তি, দীর্ঘ ধর্না, আটক এবং এফআইআর। বুধবার সেই সংঘাতের রেশ কাটার আগেই মধ্যাহ্নভোজের টেবিলে পরবর্তী আন্দোলনের ছক কষল বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোট। দিল্লির জনপথে সাগর রত্না রেস্তরাঁয় কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গের ডাকে বৈঠকে বসেন বিরোধী সাংসদেরা। লক্ষ্য, ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে অনিয়মের অভিযোগকে আরও জোরালো ভাবে জনতার দরবারে নিয়ে যাওয়া এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া।
মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন হলেও বিরোধীদের রাজনৈতিক বার্তা ছিল স্পষ্ট। আরজেডি সাংসদ মনোজ ঝা-র কথায়, ‘‘লাঞ্চ হবে, হয়তো লঞ্চও হবে!’’ অর্থাৎ, খাবার টেবিলেই শেষ নয়, সেখান থেকে নতুন কর্মসূচির সূচনা হতে পারে—সেই ইঙ্গিতই দিয়েছিলেন তিনি।
বুধবারের বৈঠকে ছিলেন রাহুল গান্ধী, প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা-সহ বিরোধী শিবিরের একাধিক নেতা। মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেখা করার দাবিতে মিছিল করে কমিশনের দফতরের দিকে এগোতে চেয়েছিলেন বিরোধী সাংসদেরা। পুলিশ তাঁদের আটকে দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে আকাশবাণী ভবনের ভিতরে গিয়ে ধর্নায় বসেন রাহুল-সহ কয়েক জন সাংসদ। দীর্ঘ সময় অবস্থানের পর পুলিশ তাঁদের সরিয়ে আটক করে। রাতের দিকে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
এই ঘটনার পর বুধবার রাহুল ও প্রিয়ঙ্কার বিরুদ্ধে অনুমতি ছাড়া আকাশবাণী ভবনে প্রবেশ এবং সেখানে ধর্না দেওয়ার অভিযোগে এফআইআর দায়ের হয়। কিন্তু তাতে যে তিনি পিছিয়ে আসছেন না, তা বুঝিয়ে দিয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা। এফআইআর প্রসঙ্গে রসিকতার সুরে রাহুল বলেন, ‘‘আমার বিরুদ্ধে ৪৫টি এফআইআর রয়েছে। লক্ষ্য ১০০।’’
তবে তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে। রাহুলের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে। বিরোধীদের দাবি, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নিরপেক্ষ জবাব দিতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। সেই দাবিতেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি তুলেছে তারা।
বুধবারের বৈঠকের পর বিরোধীদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়েও বার্তা আসে। রাহুল জানান, এ বার নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে গিয়ে আন্দোলন করতে চান তাঁরা। তাঁর বক্তব্য, মঙ্গলবার পুলিশ তাঁদের সেখানে যেতে দেয়নি। তাই বুধবার নির্ধারিত জায়গায় বসেই দেশের মানুষের কাছে নিজেদের অভিযোগ পৌঁছে দিতে চান বিরোধীরা।
খড়্গেও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ‘ভোটচুরি’র অভিযোগ তাঁরা শুধু সংসদ বা কমিশনের দফতরে সীমাবদ্ধ রাখবেন না, মানুষের কাছে নিয়ে যাবেন। বিরোধীদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার উত্তর দেওয়া কমিশনের দায়িত্ব। অন্য দিকে, নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি বিরোধীদের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
তবে বুধবারের বৈঠকে একটি রাজনৈতিক সমীকরণও নজর কেড়েছে। মঙ্গলবারের প্রতিবাদে সক্রিয় ভাবে অংশ নিলেও সাগর রত্নার মধ্যাহ্নভোজের বৈঠকে সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব এবং তাঁর দলের সাংসদদের দেখা যায়নি। কেন তাঁরা বৈঠকে অনুপস্থিত ছিলেন, তা নিয়ে কোনও স্পষ্ট কারণ সামনে আসেনি। ফলে বিরোধী জোটের ঐক্য এবং পরবর্তী আন্দোলনে বিভিন্ন দলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এক দিকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের লাগাতার অভিযোগ, অন্য দিকে সেই অভিযোগ খারিজ করে কমিশন ও বিজেপির অবস্থান—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হচ্ছে। মঙ্গলবারের ধর্না ও আটক, বুধবারের মধ্যাহ্নভোজ এবং তার পরের প্রতিবাদ—ঘটনাক্রম বলছে, ‘ভোটচুরি’ বিতর্কে আপাতত পিছু হটতে নারাজ বিরোধী শিবির। এখন দেখার, এই আন্দোলন কতটা সংগঠিত রূপ নেয় এবং বিরোধীদের দাবির জবাবে নির্বাচন কমিশন কী পদক্ষেপ করে।
