ওয়াশিংটন: পাহাড়ের নীচে গভীর সুড়ঙ্গ। বাইরে থেকে প্রায় অদৃশ্য। অথচ সেই ‘গোপন’ ঘাঁটির উপরেই এখন নজর আমেরিকা ও আন্তর্জাতিক পরমাণু নজরদারি সংস্থার। ইরানের পিক্যাক্স মাউন্টেন এলাকায় নতুন করে নির্মাণকাজ এবং নড়াচড়ার ইঙ্গিত মিলেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)। তবে সুড়ঙ্গের ভিতরে ঠিক কী হচ্ছে, তা এখনও সরেজমিনে যাচাই করতে পারেনি আইএইএ। আর এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—তেহরান ‘বাড়াবাড়ি’ করলে ফের হামলা হতে পারে।
আইএইএ-র ডিরেক্টর জেনারেল রাফায়েল গ্রোসি বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, দূর থেকে পাওয়া ছবি ও নজরদারি-তথ্যে পিক্যাক্স মাউন্টেন এলাকায় কিছু নতুন নড়াচড়া এবং নির্মাণকাজের ইঙ্গিত দেখা গিয়েছে। কিন্তু সেখানে ঠিক কী ধরনের কাজ চলছে, সে বিষয়ে এখনও কোনও ‘নির্দিষ্ট তথ্য’ তাদের হাতে নেই। অর্থাৎ, কার্যকলাপের অস্তিত্বের ইঙ্গিত মিললেও সেটি পরমাণু কর্মসূচির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
পিক্যাক্স মাউন্টেন রয়েছে ইরানের জাগরোস পর্বতমালায়, নাতাঞ্জের প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের কাছাকাছি। তেহরান থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার দক্ষিণে এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তৈরি হয়েছে গভীর ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ব্যবস্থা। মূল উদ্দেশ্যই ছিল গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু পরিকাঠামোকে আকাশপথের হামলা থেকে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখা। আইএইএ-র বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ছ’বছর আগে ইরানের একটি সেন্ট্রিফিউজ-সংক্রান্ত কারখানায় নাশকতার পর পাহাড়ের ভিতরে পরমাণু পরিকাঠামো সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা জোরদার হয়েছিল।
সেন্ট্রিফিউজ হল ইউরেনিয়ামের বিভিন্ন আইসোটোপ আলাদা করার যন্ত্র। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পারমাণবিক জ্বালানি তৈরিতেও এর প্রয়োজন হয়, আবার অত্যন্ত উচ্চ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে একই প্রযুক্তি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথেও ব্যবহারযোগ্য। সেই কারণেই পিক্যাক্স মাউন্টেনের মতো গভীর ভূগর্ভস্থ পরিকাঠামো নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ এত বেশি।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, আইএইএ-র পরিদর্শকেরা এখনও ওই সুড়ঙ্গগুলির ভিতরে ঢুকে পরিস্থিতি যাচাই করতে পারেননি। ফলে সেখানে কোনও সেন্ট্রিফিউজ রয়েছে কি না, ইউরেনিয়াম মজুত করা হয়েছে কি না, কিংবা নির্মাণকাজের উদ্দেশ্যই বা কী—কোনও প্রশ্নেরই নিশ্চিত উত্তর এখন নেই।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই নতুন করে তীব্র হয়েছে আমেরিকা-ইরান উত্তেজনা। ট্রাম্প গত বুধবারই প্রকাশ্যে পিক্যাক্স মাউন্টেনে ‘নড়াচড়া’র কথা তুলে ইরানকে সতর্ক করেছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, তেহরান যদি কোনও উস্কানিমূলক পদক্ষেপ নেয়, তা হলে আমেরিকা কঠোর সামরিক জবাব দিতে পারে। গত কয়েক দিন ধরেই ট্রাম্প এই ঘাঁটির দিকে প্রকাশ্যে নজর দিচ্ছেন।
পিক্যাক্স মাউন্টেনকে ঘিরে আশঙ্কার আরও একটি কারণ তার অবস্থান এবং গঠন। ভূগর্ভে গভীর সুড়ঙ্গ থাকায় সাধারণ বিমান হামলায় সেটিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা কঠিন হতে পারে। ফলে কোনও সামরিক অভিযান হলে আমেরিকার জন্য এটি তুলনামূলক ভাবে কঠিন লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে। গত সপ্তাহেও ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, প্রয়োজন হলে এই স্থাপনায় হামলার কথা বিবেচনা করছে ওয়াশিংটন।
এ দিকে, ইরান বরাবরই দাবি করে এসেছে যে তার পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বেসামরিক ব্যবহারের জন্য। পশ্চিমা দেশগুলির অভিযোগ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে তেহরানের অবস্থান উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুনে ইজরায়েল ও আমেরিকার হামলার পর থেকে ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলিতে আইএইএ-র নজরদারি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে আইএইএ-র সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা না মানার অভিযোগে আইএইএ-র বোর্ড এ বার বিষয়টি রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০ বছর পরে ইরানের ক্ষেত্রে এমন পদক্ষেপ করা হল। ৯ সেপ্টেম্বরের ভোটে প্রস্তাবটি ২৩টি দেশের সমর্থন পেয়েছে; রাশিয়া, চিন এবং নাইজার বিরোধিতা করেছে।
অর্থাৎ, একই সময়ে তিনটি চাপ তৈরি হয়েছে তেহরানের উপর—এক দিকে পিক্যাক্স মাউন্টেনে নতুন কার্যকলাপ নিয়ে সন্দেহ, দ্বিতীয়ত আইএইএ-র পর্যবেক্ষণ ও যাচাই নিয়ে অচলাবস্থা, তৃতীয়ত নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি যাওয়ার সম্ভাবনা। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ট্রাম্পের সামরিক হুমকি।
তবে আইএইএ-র বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও রয়েছে। গ্রোসি স্পষ্ট করে বলেছেন, পিক্যাক্স মাউন্টেনে ‘নড়াচড়া’ দেখা গেলেও সেখানে কী কাজ হচ্ছে, তার কোনও নির্দিষ্ট তথ্য তাঁদের হাতে নেই। ফলে এখনই সেখানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাজ চলছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
কিন্তু আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জায়গাটি অন্যত্র। আইএইএ-র প্রধান সতর্ক করেছেন, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি দেশ পরমাণু অস্ত্র অর্জনের কথা ভাবতে শুরু করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার বাড়লে এক সময় তার ব্যবহার হওয়ার সম্ভাবনাও মারাত্মক ভাবে বাড়বে।
তার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আঁচ পড়ছে জ্বালানি বাজারেও। ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা এবং হরমুজ ও লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগের কারণে বৃহস্পতিবার ব্রেন্টের দাম ১০৫ ডলারের উপরে উঠে গিয়েছে এবং WTI-ও ১০০ ডলার পেরিয়েছে। ফলে পিক্যাক্স মাউন্টেনে নতুন কোনও সামরিক পদক্ষেপ শুধু পরমাণু সংকটই বাড়াবে না, বিশ্ববাজারেও বড় ধাক্কা দিতে পারে।
পাহাড়ের নীচে ঠিক কী তৈরি হচ্ছে, ইরানের হাতে পরমাণু কর্মসূচির কতটা সক্ষমতা এখনও অক্ষত, এবং আইএইএ কবে ফের সরেজমিনে তা যাচাই করতে পারবে—এই তিন প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার আগে পিক্যাক্স মাউন্টেনে সামান্য ‘নড়াচড়া’ও যে ওয়াশিংটন-তেহরান সংঘাতকে আরও এক ধাপ বিপজ্জনক করে তুলতে পারে, তা স্পষ্ট।




