রাঁচী, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: এক পক্ষের দাবি ছিল, পরীক্ষা বাতিল হোক। অন্য পক্ষের আর্তি, পরীক্ষা বাতিল হলে তাঁদের চাকরি চলে যাবে! ঝাড়খণ্ডে JSSC-CGL পরীক্ষা ঘিরে তৈরি হয়েছে এমনই অদ্ভুত পরিস্থিতি। প্রায় এক মাস ধরে চলা ছাত্র আন্দোলনের চাপে হেমন্ত সোরেন সরকার JSSC-CGL ২০২৪-সহ বেসরকারি সংস্থা TDPL-এর মাধ্যমে হওয়া একাধিক পরীক্ষা ও নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পরই রাস্তায় নেমেছেন পরীক্ষায় পাশ করে ইতিমধ্যে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া প্রায় ২,০০০ কর্মপ্রার্থী। তাঁদের আশঙ্কা, পরীক্ষাই বাতিল হলে বৈধ ভাবে পাওয়া চাকরিও হাতছাড়া হবে।
সোমবার ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন ঘোষণা করেন, TDPL-এর মাধ্যমে হওয়া পরীক্ষা ও নিয়োগ বাতিল করা হবে। JSSC-CGL-সহ সংশ্লিষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিলের পাশাপাশি ২০১৪ সাল থেকে রাজ্যে হওয়া নিয়োগ পরীক্ষায় কোনও অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্তও হয়েছে। তদন্তের পাশাপাশি নিয়োগ ব্যবস্থায় সংস্কারের জন্য আইএএস আধিকারিক অমিতাভ কৌশলের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠনের কথাও জানিয়েছে সরকার।
এই সিদ্ধান্তে স্বস্তি পেয়েছেন আন্দোলনরত ছাত্রদের একাংশ। তাঁদের অভিযোগ ছিল, TDPL-এর মাধ্যমে হওয়া পরীক্ষাগুলিতে নানা অনিয়ম হয়েছে। প্রায় ২৪ দিন ধরে রাঁচীতে আন্দোলন চলছিল। ছাত্রনেতা দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো-সহ কয়েক জন অনশনেও বসেছিলেন। পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা আসার পর তিনি অনশন প্রত্যাহার করেন। তবে আন্দোলনকারীদের আরও একটি বড় দাবি—পুরো ঘটনায় সিবিআই তদন্ত, এখনও বিতর্কের জায়গায় রয়েছে।
কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্তে অন্য একটি গোষ্ঠীর মাথায় হাত। JSSC-CGL ২০২৪-এ সফল হয়ে ইতিমধ্যেই সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন প্রায় ২,০০০ জন। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা কোনও অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত নন। পরীক্ষায় পাশ করে সরকারি নিয়ম মেনে নিয়োগপত্র পেয়েছেন, চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। এখন পরীক্ষা বাতিল করে তাঁদের কেন শাস্তি পেতে হবে—এই প্রশ্ন তুলেই মঙ্গলবার রাঁচীতে ঝাড়খণ্ড সচিবালয়ের বাইরে বিক্ষোভ শুরু করেন তাঁরা।
আবেগঘন হয়ে এক চাকরিপ্রার্থী রঘুবেন্দ্র জানান, মুখ্যমন্ত্রী নিজেই তাঁকে নিয়োগপত্র দিয়েছিলেন। সেই সরকারের সিদ্ধান্তেই এখন তাঁর চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কা। চাত্রার বাসিন্দা রঘুবেন্দ্র আগে গয়ার একটি স্কুলে সমাজবিজ্ঞান পড়াতেন। CGL-এ নিয়োগের ফল প্রকাশের পর কিছুটা সংশয় থাকলেও ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট নিয়োগ বাতিলের বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার পর তিনি চাকরিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ৮ জানুয়ারি শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দেন। এখন তাঁর বয়সও এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে নতুন করে বহু নিয়োগ পরীক্ষায় বসার সুযোগ নেই।
শুধু রঘুবেন্দ্র নন, বহু নির্বাচিত প্রার্থীরই একই অবস্থা। কেউ পুরনো চাকরি ছেড়েছেন, কেউ পরিবার চালানোর দায়িত্ব নিয়েছেন, কারও বিয়ে বা ঋণের দায় রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, পরীক্ষায় যদি অনিয়ম হয়ে থাকে, তদন্ত হোক। যাঁরা দোষী, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু সবাইকে একসঙ্গে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া কেন হবে?
ফলে ঝাড়খণ্ডে এখন একই নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে মুখোমুখি দুই পক্ষ। এক দিকে পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও অনিয়মের তদন্তের দাবিতে আন্দোলনরত চাকরিপ্রার্থীরা। অন্য দিকে সেই পরীক্ষায় সফল হয়ে চাকরি পাওয়া প্রায় ২,০০০ তরুণ-তরুণী, যাঁরা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে পথে নেমেছেন। তাঁদের স্লোগান “আমাদের অপরাধ কী? আমাদের চাকরি কেড়ে নেবেন না।”
সরকারের সামনে তাই নতুন প্রশ্ন নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে গিয়ে ইতিমধ্যে চাকরিতে যোগ দেওয়া নির্বাচিতদের ভবিষ্যৎ কী ভাবে সুরক্ষিত করা হবে? কারণ পরীক্ষা বাতিলের দাবি মেনে নেওয়ার পরেও বিতর্ক শেষ হয়নি। বরং এক আন্দোলনের জায়গা নিয়েছে আর এক আন্দোলন। ঝাড়খণ্ডের নিয়োগ-ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন এখন আরও বড়, অনিয়মের দায় কার, আর তার মাশুল কি নির্দোষ চাকরিপ্রার্থীদেরই দিতে হবে?