লন্ডন: হাতে বিপুল অর্থ, সামনে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। লক্ষ্য একটাই, বয়সকে যতটা সম্ভব পিছিয়ে দেওয়া, শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকেও হার মানানো। প্রযুক্তি দুনিয়ার একাংশের কোটিপতি ইতিমধ্যেই বার্ধক্য ঠেকানোর নানা পদ্ধতি, চিকিৎসা ও পরীক্ষায় বিপুল অর্থ ঢালছেন। কেউ কোষের বয়স কমানোর গবেষণায় লগ্নি করছেন, কেউ আবার শরীরকে দীর্ঘদিন তরুণ রাখার জন্য নিজের জীবনযাপনই আমূল বদলে ফেলেছেন। কিন্তু তাঁদের এই ‘অমরত্বের দৌড়’ নিয়েই এবার প্রশ্ন তুললেন বিশিষ্ট পদার্থবিদ জিম আল-খালিলি। তাঁর বক্তব্য, চিরকাল বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে গিয়ে মানুষ হয়তো বেঁচে থাকার আসল সময়টাই নষ্ট করে ফেলছে।
আল-খালিলির বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সহজ প্রশ্ন, মানুষের হাতে আসলে কতটা সময়? তাঁর মতে, মহাবিশ্বের বয়সের তুলনায় মানুষের অস্তিত্ব কার্যত চোখের পলকের মতো। সেই অল্প সময়ের মধ্যেই যদি জীবনের বড় অংশ শুধু বয়স ঠেকানোর চেষ্টায় ব্যয় করা হয়, তা হলে সেই অতিরিক্ত কয়েক বছর আদৌ কতটা অর্থবহ হবে, তা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষের মহাবিশ্বে থাকার সময় সীমিত। সময়ের প্রকৃতি নিয়ে যত বেশি ভাবছেন, ততই তাঁর মনে হচ্ছে, মানুষের হাতে যে সময় রয়েছে, সেটাকেই যথাসম্ভব কাজে লাগানো উচিত। মহাবিশ্বের বয়সের তুলনায় মানুষের জীবন যেন এক মুহূর্ত। সেই মুহূর্তকে আরও একটু দীর্ঘ করার পিছনে পুরো জীবন ব্যয় করা কতটা যুক্তিসঙ্গত, প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
অমরত্বের পরীক্ষায় কোটিপতিরা
বার্ধক্যকে ধীর করার চেষ্টা অবশ্য নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে প্রযুক্তি দুনিয়ার বিপুল সম্পদের মালিকদের একটি অংশ এই গবেষণায় বড় অঙ্কের টাকা ঢালছেন। তাঁদের লক্ষ্য শুধু সুস্থ ভাবে কয়েক বছর বেশি বাঁচা নয়—মানুষের আয়ু কত দূর পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব, সেই সীমাটিই বদলে দেওয়া।
এই তালিকায় আলোচিত নাম ব্রায়ান জনসন। বার্ধক্য ঠেকাতে তাঁর কঠোর জীবনযাপন এবং বিভিন্ন পরীক্ষামূলক পদ্ধতি নিয়ে বহু দিন ধরেই আলোচনা চলছে। অতীতে তিনি নিজের ১৭ বছর বয়সি ছেলের রক্তের প্লাজমা নিজের শরীরে নেওয়ার পরীক্ষাও করেছিলেন। পরে অবশ্য নিজেই জানিয়েছিলেন, সেই পদ্ধতিতে তিনি কোনও উপকার দেখতে পাননি।
শুধু জনসন নন, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ জগতের একাধিক ধনী ব্যক্তি দীর্ঘায়ু গবেষণায় অর্থ ঢালছেন। বয়সজনিত রোগের বিরুদ্ধে লড়াই, কোষের ক্ষয় কমানো এবং বার্ধক্যের জৈবিক প্রক্রিয়াকে ধীর করার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণা চলছে। তবে বার্ধক্য পুরোপুরি বন্ধ করে মানুষের অমর হয়ে যাওয়ার কোনও প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এখনও নেই। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক আলোচনাতেও অমরত্বের বদলে সুস্থ আয়ু বাড়ানোকে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘সময়’ আসলে কী?
আল-খালিলির বক্তব্যের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সময়ের প্রকৃতি। ছোটবেলায় তাঁর ইঞ্জিনিয়ার বাবা তাঁকে বলেছিলেন, আসলে কেউই জানে না সময় কী। তখন কথাটির গুরুত্ব বুঝতে পারেননি তিনি। পরে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করার সময় বুঝতে পারেন, দৈনন্দিন জীবনে সময় সম্পর্কে মানুষের যে ধারণা, পদার্থবিদ্যার জগতে তার সঙ্গে বাস্তবতার যথেষ্ট ফারাক রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে তিনি আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বের কথা তুলে ধরেছেন। একই সময় সবার জন্য একই গতিতে চলে না। কোনও পর্যবেক্ষকের গতি এবং মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের পরিস্থিতির উপর সময়ের প্রবাহের পার্থক্য হতে পারে। সহজ করে বললে, অত্যন্ত বেশি গতিতে চলা কোনও মহাকাশযানে থাকা মানুষের ঘড়ির সময় এবং পৃথিবীতে থাকা মানুষের ঘড়ির সময় এক ভাবে এগোবে না। শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রও সময়ের গতিকে প্রভাবিত করে। আল-খালিলির মতে, সময়ের এই আপেক্ষিক চরিত্রই পদার্থবিদ্যার অন্যতম বিস্ময়কর বিষয়।
সময় কি পিছিয়েও যেতে পারে?
এখানেই আরও চমকপ্রদ প্রশ্ন। অতীতে ফিরে যাওয়া কি আদৌ সম্ভব? আল-খালিলির মতে, গাণিতিক ভাবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে অতীতে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আপেক্ষিকতার তত্ত্বে এমন কিছু ‘closed timelike curve’-এর কথা রয়েছে, যেখানে অত্যন্ত বাঁকানো স্থান-কালের মধ্যে এগিয়ে যেতে যেতে কোনও পর্যবেক্ষক তাত্ত্বিক ভাবে নিজের অতীতের কোনও মুহূর্তে ফিরে আসতে পারেন।
তবে এখানেই রয়েছে বড় সমস্যা। অতীতে ফিরে গেলে একের পর এক ‘টাইম ট্রাভেল প্যারাডক্স’ তৈরি হয়। তাই গাণিতিক সমীকরণে কোনও সম্ভাবনা দেখা গেলেই বাস্তবে মানুষ অতীতে ফিরে যেতে পারবে—এমন দাবি করা যায় না। ভবিষ্যতের দিকে সময় ভ্রমণের ক্ষেত্রে অবশ্য আপেক্ষিকতার তত্ত্বে তুলনামূলক ভাবে বেশি বাস্তবসম্মত প্রভাব রয়েছে। আলোর কাছাকাছি গতিতে চলা কিংবা অত্যন্ত শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কাছে থাকার ফলে সময়ের প্রবাহের পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
কেন সময় শুধু সামনেই যায়?
আরও একটি রহস্য নিয়ে কাজ করছেন আল-খালিলি, ‘Arrow of Time’, অর্থাৎ সময়ের তীর। দৈনন্দিন জীবনে আমরা সময়কে একমুখী হিসাবেই দেখি। বরফ গলে যায়, ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়, মানুষ বুড়ো হয়, কোনও কিছু ভেঙে গেলে নিজে থেকে আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। কিন্তু মৌলিক পদার্থবিদ্যার বহু সমীকরণে সময়ের কোনও নির্দিষ্ট দিককে আলাদা করে চিহ্নিত করা হয় না।
তা হলে বাস্তব জগতে সময় কেন অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকেই এগোয়?
এই প্রশ্নের একটি ব্যাখ্যা তিনি তৈরি করেছেন বলে জানিয়েছেন আল-খালিলি। তবে তার বিস্তারিত তিনি এখনই প্রকাশ করছেন না। চলতি বছরের Royal Institution Christmas Lectures-এ সেই ব্যাখ্যা তুলে ধরার কথা তাঁর। অর্থাৎ, এক দিকে প্রযুক্তি দুনিয়ার কোটিপতিরা মানুষের আয়ুর শেষ সীমা ঠেলে আরও দূরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্য দিকে এক পদার্থবিদ মনে করিয়ে দিচ্ছেন—মানুষের আসল রহস্য হয়তো শুধু কত দিন বাঁচব নয়, বরং যে সময়টুকু হাতে আছে, সেটাকে কী ভাবে ব্যবহার করব। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞান আবার ফিরছে সময়ের সবচেয়ে গভীর রহস্যের কাছে।