কলকাতার মেসি-কাণ্ডের পর এ বার কেরল। কেরলে লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনা দলের প্রস্তাবিত সফর শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত না হলেও সেই সফর ঘিরে যেন পিছু ছাড়ছে না বিতর্ক। বিশেষ ক্রীড়া সচিব এন প্রশান্তের রিপোর্টে এ বার উঠে এল ১২৮ কোটি টাকার দুর্নীতি এবং বিদেশি মুদ্রা লেনদেন সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের সম্ভাবনার কথা।
মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশনের কাছে জমা দেওয়া ওই রিপোর্টে ইডি তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের এক সূত্রের দাবি, রিপোর্টটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর পর আগামী দিনে তা মন্ত্রিসভার সামনে পেশ করা হবে কি না কিংবা বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থাকে ১৫ মিলিয়ন ডলার বিদেশে পাঠানোর অনুমতি পাইয়ে দিতে রাজ্য সরকারের তরফে কেন্দ্রকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। ফলে এই লেনদেনে টাকা পাচারের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে রিপোর্টে।
গোটা ঘটনাকে একটি ‘বেসরকারি অনুষ্ঠান’ বলে চিহ্নিত করে অভিযোগ, সেটিকে সরকারি মদতপুষ্ট আন্তর্জাতিক ইভেন্ট হিসেবে তুলে ধরে স্পনসর সংস্থা রিপোর্টার ব্রডকাস্টিং কোম্পানি ওরফে আরবিসি-কে বাণিজ্যিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। আরও বড় প্রশ্ন তুলেছে হিসাবের গরমিল। মোট আনুমানিক খরচ ধরা হয়েছিল ২১০ কোটি টাকা। অথচ সেখানে আয়ের প্রত্যাশা করা হয় মাত্র ৮২ কোটির। অর্থাৎ মোট ১২৮ কোটি টাকার ফারাক।
রিপোর্টে আরও অভিযোগ, কোনও খোলা প্রক্রিয়া ছাড়াই আরবিসি-কে স্পনসর হিসেবে বেছে নিয়েছিল তৎকালীন সরকার। বাণিজ্যিক স্বত্বের মূল্যায়ন, সংস্থার আর্থিক সক্ষমতা কিংবা অর্থের উৎস যাচাই, কোনও কিছুই যথাযথভাবে করা হয়নি বলে দাবি। ক্রীড়া দফতরের আধিকারিকদেরও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কার্যত কোনও ভূমিকা ছিল না বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। বরং তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী এবং তাঁর ব্যক্তিগত সচিবই অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ।
অবসরপ্রাপ্ত আমলা এ জয়তিলকের বিরুদ্ধেও নিয়ম না মানার অভিযোগ তুলেছে রিপোর্ট। বলা হয়েছে, চাকরিতে থাকাকালীন কোনও অনিয়মের দায় অবসরের সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না। বর্তমান ক্রীড়ামন্ত্রী ও জেনীশের কথায়, রিপোর্ট অনুযায়ী সমস্ত যোগাযোগ তৎকালীন মন্ত্রীর মাধ্যমেই হওয়ায় প্রাক্তন মন্ত্রীও তদন্তের আওতায় আসতে পারেন। তবে তাঁর সাংবিধানিক পদ এবং স্পনসরের দায়কে এক করে দেখা যায় না বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
যদিও রিপোর্টের সমস্ত অভিযোগ খারিজ করেছেন প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী ভি আবদুরাহিমান। তাঁর দাবি, আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং স্পনসরের মধ্যেই ম্যাচ আয়োজনের চুক্তি হয়েছিল। সরকারের উপর কোনও আর্থিক দায় চাপানো হয়নি। তাঁর বক্তব্য, ক্রীড়া ও অর্থ দফতরের অনুমোদন নিয়েই আর্জেন্টিনা দলকে কেরলে আনার উদ্যোগ শুরু হয়েছিল এবং আর্জেন্টাইন ফুটবল সংস্থাকে টাকা দেওয়ার জন্য স্পনসর আরবিআই-এর অনুমতিও পেয়েছিল।
প্রথমে একটি সংস্থা শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় পরে আরবিসি স্পনসর হিসেবে আসে বলে জানিয়েছেন তিনি। এমনকি আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন-ও নিজেদের সমাজ মাধ্যমে কেরলে আর্জেন্টিনা দলের আসার কথা ঘোষণা করেছিল বলে দাবি প্রাক্তন মন্ত্রীর। ফলে মেসি-সফর বাস্তবায়িত না হলেও তার আর্থিক হিসাব ঘিরে যে নতুন করে ঝড় উঠেছে, তা এখন কোথায় গিয়ে থামে, সেটাই দেখার।