একদিকে থরে থরে সাজানো নোটের বান্ডিল, অন্যদিকে সোনার বিস্কুট ও গয়না। ঘরের ভিতরে ঢুকেই কার্যত হতবাক হয়ে যান তদন্তকারীরা। নগদের পরিমাণ এতটাই বেশি যে, তা গুনতে একের পর এক বসানো হয় পাঁচটি নোট গোনার মেশিন। প্রায় সারারাত ধরে চলে টাকা গোনার কাজ। শেষে দু'টি বড় ট্রাঙ্কে ভরে বাজেয়াপ্ত করা হয় নগদ অর্থ। সঙ্গে উদ্ধার হয় প্রায় ১৫ কেজি সোনা। এই চাঞ্চল্যকর উদ্ধারের পর বৃহস্পতিবার সকালে গ্রেফতার করা হয় অনুব্রত মণ্ডল ওরফে কেষ্ট-ঘনিষ্ঠ পাথর ব্যবসায়ী নাজিবুদ্দিন ওরফে টুলু মণ্ডলের আত্মীয় মিনার মণ্ডলকে।
বুধবার মহম্মদবাজারের দেউচায় মিনার মণ্ডলের বাড়িতে শুরু হয় তল্লাশি। রাতভর অভিযান চলার পর তদন্তকারীরা উদ্ধার করেন সাড়ে ২৮ কোটি টাকা নগদ এবং প্রায় ১৫ কেজি সোনা। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, নগদ, সোনা এবং অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ মিলিয়ে উদ্ধার হওয়া সম্পত্তির বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে। যদিও এই অঙ্কের সরকারি নিশ্চিতকরণ এখনও হয়নি।
রাতভর 'সিজার লিস্ট', ভোরে কড়া নিরাপত্তায় বাজেয়াপ্ত সম্পদ
উদ্ধার হওয়া বিপুল নগদ ও সোনার হিসাব তৈরিতে রাত কাবার হয়ে যায় তদন্তকারীদের। প্রতিটি বান্ডিলের নম্বর নথিভুক্ত করে তৈরি হয় 'সিজার লিস্ট'। বৃহস্পতিবার সকালে কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় ট্রাঙ্কে ভরে সেই নগদ এবং সোনা সিউড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। একই সঙ্গে মিনার মণ্ডলকে গ্রেফতার করে আদালতে পেশের প্রস্তুতি শুরু হয়। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাড়িটি সিল করে দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তার চাদরে দেউচা
অভিযানের পর থেকেই কার্যত দুর্গে পরিণত হয়েছে দেউচা। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে মিনারের বাড়ির চারপাশে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশ। গোটা এলাকা ঘিরে রাখা হয়। সাধারণ মানুষের যাতায়াতেও ছিল কড়া নজরদারি। উদ্ধার হওয়া বিপুল সম্পদ নিরাপদে সরিয়ে নিতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়।
স্ত্রীর দাবি, ‘টাকা আমাদের নয়’
গ্রেফতারের পর মিনার মণ্ডলের পরিবারের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর স্ত্রীর বক্তব্য, “প্রায় এক বছর আগে টুলু মণ্ডল এই টাকা আমাদের বাড়িতে রেখে গিয়েছিলেন। বলা হয়েছিল, সমস্ত কাগজপত্র রয়েছে। আলমারির চাবিও ওঁর কাছেই ছিল। আমাদের সংসার পেনশনের টাকায় চলে। এই টাকা বা সোনার বিষয়ে আমরা কিছুই জানতাম না।”
তদন্তকারীরা অবশ্য এই দাবি খতিয়ে দেখছেন। একজন বাড়ির মালিকের অজান্তে এত বিপুল নগদ ও সোনা দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সরকারি চাকরি, পাশাপাশি পাথর ব্যবসার যোগ
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মিনার মণ্ডল পেশায় সরকারি বাসচালক। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরেই পাথর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অভিযোগ, টুলু মণ্ডলের একাধিক পাথর খাদানের দেখভাল এবং আর্থিক লেনদেনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেই সূত্রেই তদন্তকারীদের সন্দেহ, উদ্ধার হওয়া নগদ ও সোনার সঙ্গে পাথর ব্যবসার আর্থিক লেনদেনের যোগ থাকতে পারে।
তদন্তের কেন্দ্রে পাথর শিল্প
বীরভূমের পাথর খাদানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই বেআইনি আর্থিক লেনদেন, কর ফাঁকি এবং কালো টাকার অভিযোগ রয়েছে। অতীতেও একাধিক তদন্তে কেষ্ট-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের নাম উঠে এসেছে। সম্প্রতি টুলু মণ্ডলের বাড়ি থেকেও বিপুল নগদ উদ্ধারের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। তার কয়েক দিনের মধ্যেই আত্মীয়ের বাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা ও সোনা উদ্ধারে তদন্তে নতুন মোড় এসেছে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
শুরু রাজনৈতিক চাপানউতোর
ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তীব্র তরজা। রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ দাবি করেন, “কয়লা ও পাথর খাদানকে ঘিরে যারা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল, তাদের বিরুদ্ধে এখন একের পর এক তথ্য সামনে আসছে। তদন্ত এগোলে আরও অনেক তথ্য প্রকাশ্যে আসবে।”
যদিও এই মন্তব্য নিয়ে এখনও তৃণমুলের তরফে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
আরও কারা জড়িত?
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, এই অভিযান কেবল শুরু। উদ্ধার হওয়া নথি, ব্যাঙ্ক লেনদেন, সম্পত্তির কাগজ, ব্যবসায়িক হিসাব এবং মোবাইল ফোনের তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এত বিপুল নগদ ও সোনার প্রকৃত মালিক কে, এই অর্থের উৎস কী এবং এর সঙ্গে আর কারা যুক্ত— সেই উত্তর খুঁজতেই তদন্তের জাল আরও বিস্তৃত করা হচ্ছে।
বীরভূমের এই বিপুল নগদ উদ্ধারের ঘটনায় রাজ্য রাজনীতির পাশাপাশি প্রশাসনিক মহলেও তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। তদন্ত যত এগোবে, ততই সামনে আসতে পারে আরও বিস্ফোরক তথ্য— এমনই মনে করছেন তদন্তকারীদের একাংশ।