হাবিবুর রহমান, ঢাকা: বাংলাদেশে খুলনাঞ্চলে ভেজাল খাদ্যদ্রব্যে বাজার সয়লাব। খাদ্যের বিষাক্ততায় নানা ধরনের জটিল রোগ এখন প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে। তাই বাজারজাত সকল খাদ্য ও পানীয় বিষ ও ভেজালমুক্ত নিশ্চিত করা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ভেজাল খাদ্যে বাজার ভরে থাকলেও প্রতিরোধের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। খুলনার বিভিন্ন উপজেলার হাট-বাজারে প্রতিনিয়ত ভেজাল খাদ্য কেনাবেচা হলেও দেখার যেন কেউ নেই।
এদিকে, খুলনা মহানগরীর ব্যস্ততম সড়ক ও মোড়গুলোর ফুটপাতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মুখরোচক খাবারের দোকান। ফুচকা, চটপটি, ফাস্টফুড থেকে শুরু করে বাহারি শরবত কী নেই সেখানে! কিন্তু চটকদার এসব খাবারের চকচকে রূপের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি। খোলা ও নোংরা পরিবেশে তৈরি এসব খাবার ও পানীয় নগরবাসীকে নিয়ে যাচ্ছে এক মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে। অথচ জনস্বাস্থ্যের ওপর এই চরম হুমকি সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও তদারকির অভাব নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নগরীর ডাকবাংলা, শিববাড়ী মোড়, রূপসা ট্রাফিক মোড়, শান্তিধাম মোড়, দৌলতপুর ও খালিশপুরের প্রধান সড়কের পাশে খোলা আকাশের নিচে তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে ফুচকা, চটপটি ও বিভিন্ন ফাস্টফুড সামগ্রী। প্রতিনিয়ত যানবাহনের বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও ধুলাবালি এসে পড়ছে ওইসব খোলা খাবারে। সস ও ভাজা খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে নিম্নমানের এবং বারবার গরম করা পোড়া তেল। স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ কিংবা ঢেকে রাখার কোনো বালাই নেই দোকানগুলোতে।
সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো এ দৃশ্য দেখা যায় বরফজল বা শরবতের দোকানগুলোতে। প্রচণ্ড গরমে তৃষ্ণা মেটাতে পথচারীরা যে ঠান্ডা শরবত বা ফলের রস পান করছেন, তাতে ব্যবহার করা হচ্ছে মাছ সংরক্ষণে ব্যবহৃত বরফ। রূপসা বা কেসিসি পাইকারি মৎস্য বাজার থেকে আসা পচা মাছ ও ক্ষতিকর অণুজীবমিশ্রিত পানি দিয়ে তৈরি এই অপরিশোধিত শিল্প-বরফ গলিয়ে নির্দ্বিধায় মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে লেবু ও রুহ আফজার শরবতে। সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ক্ষতিকর কৃত্রিম ফ্লেভার ও বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিক রং। এই বরফ মানবদেহের পরিপাকতন্ত্র ও কিডনির জন্য অত্যন্ত মারাত্মক।
খুলনার চিকিৎসকদের মতে, ফরমালিনযুক্ত খাবার এবং কীটনাশক ব্যবহৃত মাছ বা শাকসবজি খেলে মানবদেহের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে লিভার এবং কিডনিতে বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগ হতে পারে। কার্বাইড নার্ভ সিস্টেমের জন্য ক্ষতিকর। ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রেড ক্যালসিয়াম কার্বাইডে বিষাক্ত আর্সেনিক ও ফসফরাস রয়েছে, যা বিষমুক্ত ফলকে বিষাক্ত ফলে রূপান্তরিত করে। এসব খাবারে কিডনি, লিভার, ত্বক, মূত্রথলী কিংবা ফুসফুসে মারাত্মক রোগ হতে পারে। বাজারের চিপস, ওয়েফার, চকোলেট ও জুসে কার্বোহাইড্রেট, মেলামিন অতিমাত্রায় থাকায় শিশুদের জন্য ক্ষতিকর হলেও এসব খাবারের প্রতি শিশুদের আকৃষ্ট করে তোলা হচ্ছে। যে কারণে অধিকাংশ শিশু স্থূলতা ও উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যায় ভুগছে। তাছাড়াও কিডনি, লিভার, ফুসফুসসহ নানা রোগে তারা আক্রান্ত হচ্ছে।
খুলনা নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দের মতে, নগরবাসীকে সচেতন করার পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও সচেতনতামূলক সংস্থার পক্ষ থেকে নিয়মিত কোনো দৃশ্যমান অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে না।
খুলনা মেট্রোপলিটন এলাকাকে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের কবল থেকে রক্ষা করতে শুধু সচেতনতা নয়, প্রয়োজন নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা। খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ঝেড়ে ফেলে অনতিবিলম্বে কঠোর আইনি তদারকি জোরদার করতে হবে।
একই সঙ্গে সাধারণ পথচারী ও নগরবাসীকেও নিজেদের স্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতন হতে হবে। ক্ষণিকের জিহ্বার স্বাদ ও তৃষ্ণা মেটাতে গিয়ে ফুটপাতের এই বিষাক্ত খাবার ও বরফযুক্ত শরবত গ্রহণ থেকে বিরত থাকাই এখন সবচেয়ে জরুরি।




