হাবিবুর রহমান, ঢাকা : কলকাতায় একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলা সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার দুইজনের মৃত্যুর খবরে দুই পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন কালিগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামের রেবতী সরকার (৩৬)। তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে তালা ঝুলছে। চারপাশে নীরবতা। পরিবারের সদস্যরা ভারতে অবস্থান করায় বাড়িটি যেন আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে। রেবতীর স্বামী ভবেশ সরকার। তাঁদের ছেলে অনিক সরকার অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে এবং মেয়ে ত্রিশা সরকার ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। তাঁরা বর্তমানে উত্তরাখণ্ডে অবস্থান করছেন।
রেবতীর স্বজন তপন সরকার বলেন, রেবতী আমার বৌদি। বুধবার রাতে বৌদির ছেলের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে একটি হোটেলে আগুন লেগে বৌদি মারা গেছেন। দাদা বাংলাদেশে ছিলেন, তবে এখন তাঁর সঙ্গেও ফোনে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, দাদা-বৌদির আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে, তারাও ভারতে আছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারটি কীভাবে এই শোক সামলাবে, সেটাই এখন বড় চিন্তার বিষয়।
চিকিৎসার জন্য প্রিয়জনদের ছেড়ে ভারতে গিয়েছিলেন সাজু ও রেবতী। পরিবারের আশা ছিল, চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ফিরবেন তাঁরা। কিন্তু সেই অপেক্ষা এখন পরিণত হয়েছে মরদেহ ফেরার অপেক্ষায়।
অন্যদিকে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে একই উপজেলার তারালী ইউনিয়নের বরেয়া ও তেঁতুলিয়া গ্রামের পরিবেশ। প্রিয়জনকে হারানোর শোকের সঙ্গে এখন স্বজনদের একটাই আকুতি, দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হোক তাঁদের মরদেহ।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকালে বরেয়া গ্রামে মৃত আলিমুজ্জামান সাজুর (৪৫) বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো বাড়ি। বড় ভাই, বৌদিসহ পরিবারের সদস্যরা বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। কয়েক দিন আগেও যে বাড়িতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ছিল, সেখানে এখন শুধুই শোক আর অপেক্ষা।
আলিমুজ্জামান সাজু মৃত ইউনুচ সরদারের ছেলে। তিনি পেশায় ঘের ব্যবসায়ী ছিলেন। চিকিৎসার জন্য প্রায় ছয় দিন আগে কলকাতা গিয়েছিলেন তিনি। কলকাতার ওই হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের পর তাঁর মৃত্যুর খবর জানতে পারেন পরিবারের সদস্যরা।
সাজুর বড় ভাই সাহেব সরদার বলেন, ৬ দিন আগে আমার ভাই চিকিৎসার জন্য ভারতে যায়। হঠাৎ টেলিভিশনে দেখি কলকাতার একটি হোটেলে আগুন লেগেছে। পরে জানতে পারি, ওই হোটেলেই আমার ভাই অবস্থান করছিল। একজন আত্মীয়কে সেখানে পাঠানো হয়। পরে ছবির সঙ্গে লাশের মিল পাওয়ার পর নিশ্চিত হই, আমার ছোট ভাই আর নেই।
কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন, সরকারের কাছে আকুল আবেদন, আমার ভাইয়ের মরদেহটা যেন দ্রুত দেশে এনে আমাদের কাছে দেওয়া হয়। আমরা শেষবারের মতো তাকে দেখতে চাই।
সাজুর ছোটবেলার বন্ধু ও সহপাঠী রফিকুল ইসলামও বন্ধুকে হারিয়ে শোকে কাতর। তিনি বলেন, সাজু আমার ছোটবেলার বন্ধু। আমরা দুজন একসঙ্গে এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। একসঙ্গে খেলাধুলা করেছি, বড় হয়েছি। ডাক্তার দেখাতে কলকাতায় গিয়ে সে মারা গেল, এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।
স্বজনদের কান্না আর আহাজারির মধ্যে এখন একটাই দাবি, সরকার দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে কলকাতা থেকে তাঁদের প্রিয়জনদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে দিক। শেষবারের মতো মুখটি দেখে, নিজ হাতে মাটি দিয়ে আপনজনকে বিদায় দিতে চান তাঁরা।
সাতক্ষীরা জেলা শাসক মিজ কাউসার আজিজ বলেন, ভারতের হাইকমিশন থেকে লাশ দুটো দ্রুত প্রেরণের ব্যবস্থা করছে তারা। পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী আধিকারিকরা যোগাযোগ করেছেন।