কলকাতা: যে পুরসভা শহরের বাড়ি-বাড়ি সম্পত্তি কর আদায় করে, সেই কলকাতা পুরসভার নিজের সম্পত্তিতেই বকেয়া পড়ে রয়েছে কোটি কোটি টাকা! ক্যাগের রিপোর্টে উঠে এসেছে, পুরসভার সদর দফতর-সহ বিভিন্ন বরো অফিসের সম্পত্তি কর বাবদ প্রায় 83 কোটি 3 লক্ষ টাকা বকেয়া রয়েছে। 2016 সাল থেকে জমতে থাকা এই বিপুল অঙ্কের কর কেন সময়মতো আদায় করা হয়নি, বকেয়া আদায়ের জন্য পুরসভা কী পদক্ষেপ করেছে—তা জানতে চেয়েছে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বা CAG।
পুরসভার নিজস্ব সম্পত্তি থেকে এত টাকা বকেয়া থাকার বিষয়টিই ক্যাগের পর্যবেক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। শুধু নিজেদের সম্পত্তি নয়, সরকারি সম্পত্তির ক্ষেত্রে যে পরিমাণ সম্পত্তি কর আদায়ের কথা, তা নিয়েও পুর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে প্রকাশিত রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ সাধারণ নাগরিকের কাছ থেকে কর আদায়ের ক্ষেত্রে যে পুরসভা নিয়মিত ভাবে বকেয়া মেটানোর তাগাদা দেয়, তাদের নিজেদের সম্পত্তির করই বছরের পর বছর বকেয়া থাকল কী ভাবে, মূল প্রশ্ন সেখানেই।
ক্যাগের রিপোর্ট অনুযায়ী, 2016 সাল থেকে পুরসভার নিজস্ব একাধিক সম্পত্তির কর বকেয়া রয়েছে। সদর দফতর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বরো অফিস—কোথায় কত টাকা বকেয়া, তার হিসাবও ক্যাগের নজরে এসেছে। বকেয়া থাকা সত্ত্বেও এত দিন ধরে কেন তা আদায়ের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ করা হয়নি, সেই ব্যাখ্যাই চাওয়া হয়েছে পুর প্রশাসনের কাছে।
বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ আরও একটি কারণে। সম্পত্তি কর কলকাতা পুরসভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিজস্ব রাজস্বের উৎস। পুরসভার 2026-27 বাজেট সংক্রান্ত নথিতেও সম্পত্তি কর আদায়ের পরিমাণ এবং করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে। পুরসভার হিসাবে, 2025 সালের 31 ডিসেম্বর পর্যন্ত সম্পত্তি কর বাবদ 1,042 কোটি টাকা আদায় হয়েছিল এবং করদাতার সংখ্যা প্রায় 9.99 লক্ষে পৌঁছেছিল।
ফলে এক দিকে সাধারণ করদাতাদের কাছ থেকে সম্পত্তি কর আদায়ে পুরসভার তৎপরতা, অন্য দিকে পুরসভার নিজের সম্পত্তিতেই বছরের পর বছর বিপুল কর বকেয়া—দুই ছবির মধ্যে ফারাক নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে ক্যাগ। বিশেষত পুরসভার আর্থিক সংস্থান যখন বিভিন্ন নাগরিক পরিষেবা এবং উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তখন বকেয়া কর আদায়ে প্রশাসনিক গাফিলতি হয়েছে কি না, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
শুধু বকেয়া কর নয়, পুরসভার বিভিন্ন সময়ে চালু করা ওয়েভার স্কিম নিয়েও ক্যাগের পর্যবেক্ষণ রয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। শোভন চট্টোপাধ্যায়ের মেয়র থাকার সময় থেকে ফিরহাদ হাকিমের মেয়রত্ব—বিভিন্ন সময়ে সম্পত্তি করের বকেয়া মেটাতে পুরসভা একাধিক ছাড় প্রকল্প চালু করেছে। তাতে বকেয়া করের একটি অংশ আদায় হলেও করদাতাদের সুদ ও জরিমানায় বড় অঙ্কের ছাড় দিতে হয়েছে। সেই নীতির আর্থিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পুরসভার আর্থিক পরিস্থিতির সঙ্গে এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাস্তা, নিকাশি, পানীয় জল, জঞ্জাল পরিষ্কার থেকে শুরু করে পুরকর্মীদের বেতন-পেনশন—বিভিন্ন খাতে পুরসভার নিয়মিত খরচ রয়েছে। ফলে নিজস্ব রাজস্ব আদায় কম হলে উন্নয়নমূলক কাজের উপর তার প্রভাব পড়তে পারে। ক্যাগের পর্যবেক্ষণে সেই রাজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেন, ‘‘কোনও সংস্থা চালানোর জন্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। আর সেটা যদি না থাকে, তা হলে একটা সংস্থা মুখ থুবড়ে পড়বে।’’ তাঁর বক্তব্য, পুরসভার বিপুল অর্থ বেতন ও পেনশন খাতে চলে যায়। সেই পরিস্থিতিতে উন্নয়নমূলক কাজ চালিয়ে যেতে কর সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ। তাই সম্পত্তি কর আদায়ের বিষয়টি পুরসভার গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত বলেই মত তাঁর।
অন্য দিকে, বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ সরাসরি পুর প্রশাসনকে নিশানা করেছেন। তাঁর দাবি, ক্যাগের রিপোর্টে যে 83 কোটি টাকার বকেয়ার কথা সামনে এসেছে, প্রকৃত অঙ্ক আরও বেশি হতে পারে। তাঁর অভিযোগের তির প্রাক্তন বাম পুরবোর্ড এবং তৃণমূল পরিচালিত পুর প্রশাসন—দুই সময়ের দিকেই। তবে এই বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক অভিযোগ হিসাবেই এসেছে; ক্যাগের রিপোর্টে উল্লিখিত অঙ্কের বাইরে অতিরিক্ত বকেয়ার কোনও স্বাধীন হিসাব প্রকাশ্যে আসেনি।
এর আগে কলকাতা পুরসভার সম্পত্তি কর আদায় নিয়ে ক্যাগের বিভিন্ন রিপোর্টে অনাদায় এবং কর-ছাড় সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণও সামনে এসেছে। পুরসভার সম্পত্তি কর ব্যবস্থায় 2017 সাল থেকে Unit Area Assessment বা UAA পদ্ধতি চালু হয়েছে। পুরসভার নিজস্ব ওয়েবসাইটেও সম্পত্তি কর নির্ধারণ ও আদায়ের জন্য এই ব্যবস্থার বিস্তারিত নিয়ম এবং অনলাইন পরিষেবার কথা উল্লেখ রয়েছে।
এখন প্রশ্ন, ক্যাগের নজরে আসা 83 কোটি 3 লক্ষ টাকার বকেয়া কী ভাবে আদায় করবে পুরসভা? কোন কোন সম্পত্তিতে কত টাকা বকেয়া, কেন বছরের পর বছর তা অনাদায়ী রইল এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকেরা সময়মতো কী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন—এই প্রশ্নগুলির উত্তরই চাইছে অডিট রিপোর্ট। পুরসভার আর্থিক চাপের আবহে ক্যাগের এই পর্যবেক্ষণ তাই শুধু বকেয়া করের হিসাব নয়, পুর প্রশাসনের রাজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিল।