নয়াদিল্লি: পর্যটকের ছদ্মবেশে সমুদ্রের বুকে ডুবসাঁতারের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে জঙ্গিরা! পাকিস্তানের করাচি উপকূলের কাছে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র চরনা দ্বীপকে ঘিরে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তইবার সদস্যদের সেখানে স্কুবা ডাইভিং, কমব্যাট সুইমিং এবং জলের নীচে বিশেষ অভিযানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ পর্যটকদের সঙ্গে মিশে গিয়ে এই প্রশিক্ষণ চলছে বলে আশঙ্কা। বিষয়টি সামনে আসতেই ভারতের উপকূলীয় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষত, ২০০৮ সালের ২৬/১১ মুম্বই হামলার স্মৃতি ফের উস্কে দিয়েছে এই খবর।
সংবাদ সংস্থা সূত্রের খবর, করাচি থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে আরব সাগরের বুকে অবস্থিত চরনা দ্বীপে লস্করের একটি বিশেষ সামুদ্রিক শাখার সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। গোয়েন্দা মহলে এই শাখাটি 'দাওয়া মেরিন উইং' অথবা 'সাদা-এ-হুরিয়ত' নামে পরিচিত। সূত্রের দাবি, প্রশিক্ষণার্থীরা পর্যটক পরিচয়ে দ্বীপে যাতায়াত করছেন। ফলে সাধারণ পর্যটন ও জলক্রীড়ার আড়ালে জঙ্গিদের সামুদ্রিক প্রশিক্ষণ চলছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
প্রশিক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে পাকিস্তানের মার্কাজি মুসলিম লিগ (পিএমএমএল)-এর সদস্যেরা বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি। এই সংগঠনকে লস্করের রাজনৈতিক মুখোশ বা সহযোগী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রশিক্ষণে স্কুবা ডাইভিংয়ের পাশাপাশি কমব্যাট সুইমিং এবং জলের নীচে চলাফেরার দক্ষতার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে বলে খবর। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রপথে অভিযান চালানোর সক্ষমতা বাড়ানোই এমন প্রশিক্ষণের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য।
কেন চরনা দ্বীপ?
প্রশ্ন উঠছে, পাকিস্তানের একাধিক জলাশয় ও উপকূলীয় এলাকা থাকতে চরনা দ্বীপকেই কেন বেছে নেওয়া হচ্ছে? দ্বীপটি স্কুবা ডাইভিং, স্নরকেলিং এবং বিভিন্ন জলক্রীড়ার জন্য জনপ্রিয়। স্বচ্ছ জল এবং প্রবালপ্রাচীরের উপস্থিতির কারণে এখানে পর্যটকদের আনাগোনা রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের ভিড়ে বিশেষ প্রশিক্ষণকে আড়াল করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে বলে গোয়েন্দাদের আশঙ্কা।
এ ছাড়া করাচি উপকূল ও আরব সাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের কাছাকাছি অবস্থান দ্বীপটির কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়েছে। তবে চরনা দ্বীপে প্রশিক্ষণের অভিযোগের বাইরে নির্দিষ্ট কোনও হামলার পরিকল্পনা বা লক্ষ্য সম্পর্কে এখনও প্রকাশ্যে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
২৬/১১-র স্মৃতি কেন ফিরছে?
২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বইয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ক্ষেত্রে সমুদ্রপথ ব্যবহার করেছিল লস্কর-ই-তইবার জঙ্গিরা। পাকিস্তান থেকে জলপথে এসে মুম্বইয়ের উপকূলে পৌঁছেছিল হামলাকারীরা। ওই হামলায় ১৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ভারতের উপকূলীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়েও তখন বড় প্রশ্ন উঠেছিল।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ২০০৮ সালের পর থেকেই লস্করের একটি ছোট সামুদ্রিক শাখা সক্রিয় রয়েছে। এর আগে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের মাংলা বাঁধ এবং জঙ্গি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সুইমিং পুলেও তাদের জলভিত্তিক প্রশিক্ষণের তথ্য সামনে এসেছিল। এ বার সেই প্রশিক্ষণকে আরও সংগঠিত করে সমুদ্রকেন্দ্রিক অভিযানের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে বলে আশঙ্কা।
কাশ্মীরেও জঙ্গি মডিউলের খোঁজ
এ দিকে শুক্রবার জম্মু ও কাশ্মীরে জঙ্গি নিয়োগ ও অনলাইন মৌলবাদী প্রচারের অভিযোগে একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালিয়েছে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স কাশ্মীর (সিআইকে)। শ্রীনগর, বুদগাম, বিজবেহারা, মাত্তান এবং পুলওয়ামার মোট ৬টি জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়। তদন্তকারীদের দাবি, সমাজমাধ্যমের মাধ্যমে তরুণদের প্রভাবিত করে জঙ্গি সংগঠনে নিয়োগের চেষ্টা চলছিল। তল্লাশিতে বেশ কিছু ডিজিটাল যন্ত্র এবং নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
তদন্তের সূত্রে ২২ বছর বয়সি মহম্মদ ইয়াসিন মিরের বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়েছে। তাঁর মা তাবাসসুম শাহিন পাকিস্তানের নাগরিক। গত বছরের ২৯ এপ্রিল তিনি পাকিস্তানে চলে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেননি বলে জানা গিয়েছে। ছেলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়টিও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
উপকূলীয় নিরাপত্তায় নতুন চ্যালেঞ্জ
ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলি গোটা বিষয়টির উপর নজর রাখছে বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি। ২০২৫ সালের মে মাসে 'অপারেশন সিঁদুর'-এর সময় পাকিস্তানে লস্করের একাধিক পরিকাঠামোয় ভারতীয় বাহিনী হামলা চালিয়েছিল। তার পরেও সংগঠনটি সামুদ্রিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে কি না, তা বিশেষ ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থলপথের পাশাপাশি সমুদ্রপথে জঙ্গি অনুপ্রবেশের আশঙ্কা মোকাবিলা করা ভারতের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সমুদ্রসীমার বিস্তৃতি, বাণিজ্যিক জাহাজের নিয়মিত যাতায়াত এবং পর্যটনকেন্দ্রের বিপুল ভিড়ের মধ্যে সন্দেহজনক গতিবিধি চিহ্নিত করা কঠিন। ফলে উপকূলরক্ষী বাহিনী, নৌবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসছে। তবে চরনা দ্বীপে প্রশিক্ষণের অভিযোগকে ঘিরে উদ্বেগ থাকলেও নতুন কোনও হামলা আসন্ন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো নিশ্চিত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।




