বিশেষ প্রতিবেদন: মহাত্মা গান্ধীকে চোখ বন্ধ করে কল্পনা করলেই যে ছবিটি সবচেয়ে আগে ভেসে ওঠে, তার মধ্যে অন্যতম হল তাঁর সরল পোশাক, কোমরে জড়ানো সাদা খদ্দরের কাপড়, কখনও তার সঙ্গে একটি চাদর, হাতে লাঠি এবং মুখে শান্ত অথচ দৃঢ় অভিব্যক্তি। অথচ গান্ধীর জীবনের শুরুর দিকের ছবি দেখলে সম্পূর্ণ অন্য এক মানুষকে দেখা যায়। তরুণ বয়সে তিনি পাশ্চাত্য ধাঁচের পোশাক পরতেন এবং লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়ার সময় পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে যথেষ্ট সচেতনও ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক চিন্তার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পোশাকেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে। কিন্তু ভারতের মাটিতে ফিরে এসে সাধারণ মানুষের জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার পর তাঁর কাছে পোশাক আর ব্যক্তিগত রুচির বিষয় হয়ে থাকেনি। তা হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক দর্শন, আত্মসংযম এবং দেশের দরিদ্র মানুষের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার একটি প্রতীক। শেষ পর্যন্ত ১৯২১ সালে মাদুরাইয়ে নেওয়া এক সিদ্ধান্ত তাঁর পোশাককে এমন একটি ঐতিহাসিক পরিচয়ে পরিণত করে, যা আজও গান্ধীর নামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে।
গান্ধীর পোশাক বদলের গল্প বুঝতে হলে তাঁর স্বদেশি ও খদ্দর আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কটি বুঝতে হবে। ব্রিটিশ শাসনের সময় ভারতীয় বাজারে বিদেশি কাপড়ের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। অন্যদিকে ভারতের বহু তাঁতি ও গ্রামীণ মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছিলেন। গান্ধী মনে করতেন, স্বাধীনতার লড়াই শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের লড়াই নয়; এর সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং সাধারণ মানুষের মর্যাদাও জড়িত। তাই তিনি চরকা কাটা, খদ্দর পরা এবং বিদেশি কাপড় বর্জনের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। কিন্তু মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে গিয়ে তিনি আরও একটি বাস্তব সত্য দেখতে পান, দেশের বিপুল সংখ্যক দরিদ্র মানুষ প্রয়োজনীয় পরিমাণ পোশাকও কিনতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে একজন নেতা যদি নিজে তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক ও পরিপাটি পোশাকে থাকেন এবং সেই মানুষদের বিদেশি কাপড় বর্জনের আহ্বান জানান, তাহলে তাঁর বার্তা কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে, এই প্রশ্ন তাঁকে ভাবিয়ে তোলে।
এই ভাবনারই সবচেয়ে বড় প্রকাশ দেখা যায় ১৯২১ সালের সেপ্টেম্বরে মাদুরাইয়ে। গান্ধী তখন দক্ষিণ ভারতে সফর করছিলেন এবং স্বদেশি ও খদ্দরের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছিলেন। মাদুরাইয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের পর তিনি নিজের পোশাক নিয়ে গভীরভাবে ভাবেন। ২২ সেপ্টেম্বর ১৯২১ তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি নিজের পোশাক আরও সরল করবেন এবং টুপি ও জামা পরা ছেড়ে দিয়ে মূলত কোমরে একটি কাপড় পরবেন। পরদিন, ২৩ সেপ্টেম্বর, মাদুরাইয়ের তাঁতিদের সামনে তিনি সেই নতুন পোশাকে প্রকাশ্যে আসেন। এই সিদ্ধান্তটি কোনও আকস্মিক ফ্যাশন পরিবর্তন ছিল না; বরং তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সচেতন সিদ্ধান্ত। গান্ধী বুঝেছিলেন, সাধারণ মানুষের কাছে যে বার্তা তিনি পৌঁছে দিতে চাইছেন, সেটি শুধু বক্তৃতার মাধ্যমে নয়, নিজের জীবনযাপন দিয়েও দেখাতে হবে। সেই মুহূর্ত থেকেই তাঁর সরল পোশাক ধীরে ধীরে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়।
গান্ধীর কাছে এই পোশাকের অর্থ ছিল আরও গভীর। তিনি নিজেকে দেশের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, একজন নেতা যদি সাধারণ মানুষের কষ্ট বুঝতে চান, তাহলে শুধু তাঁদের হয়ে কথা বললেই হবে না; নিজের জীবনযাপনেও সেই সংহতির প্রকাশ থাকা প্রয়োজন। তাই তাঁর পোশাক হয়ে উঠেছিল এক ধরনের নীরব রাজনৈতিক বক্তব্য। তিনি বিদেশি কাপড় বর্জনের কথা বলছেন, নিজে বিদেশি পোশাক ছেড়ে দিচ্ছেন; তিনি খদ্দরের কথা বলছেন, নিজে খদ্দর ব্যবহার করছেন; তিনি আত্মনির্ভরতার কথা বলছেন, চরকা কাটছেন। ফলে তাঁর শরীরের পোশাকই যেন তাঁর বক্তব্যের দৃশ্যমান অংশ হয়ে ওঠে। গান্ধীর রাজনৈতিক পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি যে নীতি অন্যদের অনুসরণ করতে বলতেন, তা নিজের জীবনেও প্রয়োগ করার চেষ্টা করতেন। এই কারণেই তাঁর পোশাকের পরিবর্তনকে শুধু ব্যক্তিগত সরলতা হিসেবে দেখলে বিষয়টির সম্পূর্ণ তাৎপর্য ধরা পড়ে না।
তবে গান্ধীর এই পোশাক নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। অনেকেই মনে করেছিলেন, এমন পোশাকে একজন জাতীয় নেতা আন্তর্জাতিক বা রাজনৈতিক পরিসরে অস্বাভাবিক দেখাবেন। ব্রিটিশ মহলেও তাঁর পোশাক নিয়ে নানা মন্তব্য ও বিদ্রুপ হয়েছিল। কিন্তু গান্ধী তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি। বরং তিনি দেখিয়ে দেন, একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় তাঁর পোশাকের চাকচিক্যের উপর নির্ভর করে না। ১৯৩১ সালে লন্ডনে দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিতে গিয়ে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ও তিনি তাঁর পরিচিত সরল পোশাকেই ছিলেন। এই ঘটনা তাঁর পোশাককে আন্তর্জাতিক সংবাদ ও আলোচনার বিষয় করে তোলে। পোশাকের মাধ্যমে তিনি যেন বোঝাতে চেয়েছিলেন, ভারতের স্বাধীনতার দাবিকে বোঝার জন্য ভারতের দরিদ্র মানুষের বাস্তবতাকেও বুঝতে হবে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন, গান্ধীজি সবসময় আক্ষরিক অর্থে শুধু একটি কাপড়েই থাকতেন, এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। তাঁর প্রধান পোশাক ছিল কোমরে জড়ানো কাপড় বা ধুতি/ল্যাংটির মতো সরল পোশাক, কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি চাদরও ব্যবহার করতেন। আবহাওয়া, অনুষ্ঠান কিংবা পরিস্থিতি অনুযায়ী তাঁর পোশাকে পরিবর্তনও দেখা যেত। তাই ‘এক টুকরো কাপড়’ কথাটি মূলত তাঁর সেই ঐতিহাসিক সরল পোশাকের প্রতীকী বর্ণনা, যা তাঁকে ভারতের সাধারণ মানুষের সঙ্গে দৃশ্যত একাত্ম করে দিয়েছিল। তাঁর পোশাক যতটা সরল ছিল, তার পিছনে থাকা রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তাটি কিন্তু ছিল অত্যন্ত গভীর।
গান্ধীর পোশাকের এই পরিবর্তনকে তাই শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত সরল জীবনযাপনের গল্প হিসেবে দেখলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এটি ছিল এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন কেবল শহরের সভাকক্ষ বা শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; গ্রাম, কৃষক, তাঁতি, শ্রমজীবী এবং দরিদ্র মানুষের জীবনও সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠছিল। গান্ধী নিজের পোশাককে সেই বৃহত্তর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তাঁর সাদা খদ্দরের কাপড় হয়ে উঠেছিল বিদেশি পণ্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, স্বদেশি শিল্পের সমর্থন, আত্মনির্ভরতার আহ্বান এবং দরিদ্র মানুষের সঙ্গে সংহতির প্রতীক। যে কারণে পরবর্তী সময়ে গান্ধীকে তাঁর পোশাক থেকে আলাদা করে ভাবা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।
একজন ব্যারিস্টার থেকে এমন এক নেতায় পরিণত হওয়ার এই যাত্রা আসলে গান্ধীর রাজনৈতিক দর্শনের পরিবর্তনের গল্পও বটে। জীবনের এক পর্যায়ে তিনি বুঝেছিলেন, সাধারণ মানুষকে নেতৃত্ব দিতে হলে তাঁদের জীবনযাত্রা, অভাব ও বাস্তবতাকে কেবল দূর থেকে দেখলে চলবে না। সেই উপলব্ধিই তাঁকে নিজের জীবনযাপনকে আরও সরল করার দিকে নিয়ে যায়। মাদুরাইয়ের সেই সিদ্ধান্তের পর তাঁর পোশাক আর নিছক পোশাক থাকেনি,তা হয়ে উঠেছিল একটি প্রতীক, একটি রাজনৈতিক ভাষা এবং একটি যুগের পরিচয়। তাই আজও যখন ইতিহাসের পাতায় বা পুরনো ছবিতে গান্ধীর সেই সাদা সরল পোশাক চোখে পড়ে, তখন তার মধ্যে শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং স্বাধীনতার লড়াই, স্বদেশি আন্দোলন এবং ভারতের সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর গভীর সংযোগের একটি দীর্ঘ ইতিহাসও দেখতে পাওয়া যায়।
