মালদা, নিউজ ডেস্ক: ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু কাহিনী থাকে, যা সময় পেরিয়ে ও মানুষের মনে বিস্ময় জাগিয়ে রাখে। কখনও মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা, কখনও কোনও অলৌকিক অভিজ্ঞতা আবার কখনও স্বপ্নে পাওয়া নির্দেশ, একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এমনই নানা উপাখ্যান। মালদহের একটি প্রাচীন পরিবারের দুর্গাপুজোতেও রয়েছে তেমনই এক কাহিনী, যার সূত্রপাত নবাবি আমলে।
মালদহের চাঁচলের কলিগ্রাম রায় চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজো প্রায় আড়াই শতকের থেকেও বেশি প্রাচীন। কথিত আছে, বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁয়ের আমলে খাজনা দিতে না পারায় ভয়াবহ শাস্তির মুখে পড়েছিলেন এই পরিবারের পূর্বপুরুষ বদররাম রায়চৌধুরী। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই জড়িয়ে রয়েছে দেবী দুর্গার আরাধনা শুরুর কাহিনী। পরিবারের প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী, বদররাম ছিলেন নবাবের খাজাঞ্চি। সেই সময় এলাকায় ভয়াবহ খরা দেখা দেয়। খরার কারণে কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করা সম্ভব হয়নি। ফলে, নবাবের দরবারে নির্দিষ্ট সময়ে খাজনা পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হন বদররাম। আর তার জেরেই তাঁকে কঠিন শাস্তির মুখে পড়তে হয়। শাস্তিস্বরুপ আধমরা অবস্থায় তাঁকে একটি বাক্সে বন্দি করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
কিন্তু, নিয়তির পরিহাসে সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি তাঁর জীবন। নদীতীরে তাঁর গোঙানির শব্দ শুনতে পেয়ে কয়েকজন সাধু তাঁকে উদ্ধার করেন। তাঁদের সেবাশুশ্রূষায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন বদররাম। সাধুদের প্রচেষ্টায় প্রাণ ফিরে পেলেও, তাঁর মনে বিশ্বাস জন্মায় যে দেবী দুর্গার কৃপাই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। এরপর স্বপ্নাদেশ পেয়ে নিজের বাড়িতে একচালা ছাউনির নীচে দেবী দুর্গার পুজো শুরু করেন তিনি। সেই থেকেই কলিগ্রামের রায় চৌধুরী বাড়িতে দুর্গাপুজোর প্রচলন। পরিবারের লোককথা অনুযায়ী, পরবর্তীতে বদররামকে জীবিত দেখে বিস্মিত হন নবাব আলিবর্দি খাঁ। খুশি হয়ে নবাব তাঁকে পুরস্কার হিসেবে চাঁচলের ভান্ডারিয়া, মালচা ও গালিমপুর সহ মোট পাঁচটি পরগনা উপহার দেন।
এই পরিবারের উত্তরসূরি সৌমেন রায় চৌধুরী বলেন, দুর্গাপুজো বর্তমানে সাত পুরুষ ধরে চলে আসছে। করিবর্গা দিয়ে তৈরি মন্দিরে পুজো হত। পরে সেই মন্দির ভেঙে তৈরি হয়েছে নতুন দালান। দেবীমায়ের জমিতে উৎপন্ন ফসল বিক্রির টাকা ও পরিবারের নিজস্ব খরচেই পুজোর আয়োজন করা হয়। জানাগিয়েছে, আগে বলি দেওয়ার রীতি ছিল। তার পরিবর্তে এখন দশমীতে দেবীকে মোহনভোগ নিবেদনের রীতি চালু হয়েছে।
পুজোর বিশেষ আকর্ষণ দেবী দুর্গার ডাকের সাজ। পাশাপাশি, পুজোয় দেবীর বাহন সাদা রঙের সিংহকে অসুররূপে চিত্রিত করা হয় এখানে। এই বৈশিষ্ট্যই রায় চৌধুরী পরিবারের পুজোকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি দেয়। নবমীতে হয় কুমারীপুজো।প্রতিপদ থেকে দশমী পর্যন্ত পুজোর বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন পরিবারের গৃহবধূরা। দশমীর গোধূলিলগ্নে দেবীকে বিদায় জানানোর আগে চলে সিঁদুরখেলা। গ্রামের রাণীদিঘিতে নিরঞ্জন করা হয় প্রতিবছর।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে পুজোর আয়োজন, তৈরি হয়েছে নতুন দালান। কিন্তু, বদলাইনি ঐতিহ্য ও বিশ্বাস। নবাবি আমলের সেই কাহিনী ও পারিবারিক উত্তরাধিকারের স্মৃতি বুকে নিয়ে আজও চাঁচলের কলিগ্রামে নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয় রায় চৌধুরী পরিবারের দুর্গোৎসব।




