কলকাতা: তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের মধ্যেই শুক্রবার দীর্ঘদিন পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের প্রতীক ও নাম নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের পর প্রথম সাংবাদিক বৈঠকে মমতার বক্তব্যে উঠে এল তীব্র ক্ষোভ, আবেগ এবং দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধের প্রসঙ্গ। নাম না করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরকে একাধিকবার আক্রমণ করেন তিনি।
সাংবাদিক বৈঠকে মমতা বলেন, কেউ যদি সত্যিই তৃণমূলকে ভালোবাসতেন, তাহলে দলের ‘মা’-কে কেড়ে নিতেন না। তাঁর কথায়, “যদি সত্যিই কেউ তৃণমূলকে ভালবাসত, তাহলে তৃণমূলের মা-কে কেড়ে নিত না। তৃণমূলকে মাতৃহারা করত না।” এরপরই দলের কর্মীদের আবেগের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি।
মমতার দাবি, জোড়াফুল প্রতীক শুধুমাত্র একটি নির্বাচনী চিহ্ন নয়। এর সঙ্গে দলের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও কর্মীদের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, “জোড়াফুলটা রক্ত দিয়ে গড়া। অনেক সংগ্রাম দিয়ে গড়া। অনেক ভালবাসা দিয়ে গড়া।”
‘গদ্দাররা প্রমাণ করে দিল’
নাম না করে ঋতব্রত শিবিরের বিরুদ্ধে সরব হয়ে মমতা বলেন, যারা তৃণমূলকে ছেড়ে গিয়েছেন, তাঁদের অবস্থান থেকেই নাকি স্পষ্ট হয়েছে তাঁরা দলের প্রতি কতটা অনুগত। তাঁর অভিযোগ, ‘গদ্দাররা’ প্রমাণ করে দিয়েছে যে তাঁরা তৃণমূলকে ভালোবাসেন না। মমতা আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের পর দলের কর্মীরা সারারাত কেঁদেছেন। অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরে উদযাপনের অভিযোগও তোলেন তিনি। মা ও সন্তানের সম্পর্কের উদাহরণ দিয়ে দলের সঙ্গে কর্মীদের আবেগের সম্পর্ক বোঝানোর চেষ্টা করেন মমতা।
‘সব চোর-ডাকাত’ বলে আক্রমণ
তৃণমূল ছেড়ে যাওয়া নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের প্রসঙ্গও তোলেন মমতা। নাম না করে তাঁদের ‘চোর-ডাকাত’ বলে আক্রমণ করেন তিনি। একইসঙ্গে স্পষ্ট করেন, তাঁর কাছে কোনও অভিযোগ এলে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হত।
মমতার বক্তব্য, তাঁর অজান্তে কেউ কোনও অনিয়ম করে থাকলে তার দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁর উপর চাপানো যায় না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি ভগবান নই। আমি মানুষ।”
‘চার মাস আগে নির্বাচিত, আজ বেআইনি?’
দলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে মমতা বলেন, কয়েক মাস আগে যাঁরা নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাঁদের অবস্থান কীভাবে হঠাৎ বেআইনি হয়ে যেতে পারে, তা নিয়ে তাঁর প্রশ্ন রয়েছে। দলের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর আরও অভিযোগ, দলের সম্পদ ও সংগঠন তৈরি করার ক্ষেত্রে যাঁদের ভূমিকা ছিল, এখন তাঁদেরই সেই কাঠামোয় প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। পাশাপাশি অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা কোথা থেকে আসছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
প্রতীক নিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত
তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধের জেরে নির্বাচন কমিশন বৃহস্পতিবার উভয় পক্ষকে ডেকে বৈঠক করে। এরপর আপাতত কোনও পক্ষকেই এককভাবে ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম বা পুরনো নির্বাচনী প্রতীক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়নি। দুই পক্ষকে বিকল্প নাম ও প্রতীকের প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। সেই প্রক্রিয়ার পর দুই শিবিরের জন্য পৃথক রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মমতার প্রথম সাংবাদিক বৈঠক ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে চর্চা শুরু হয়েছে। দলের নাম, প্রতীক এবং সাংগঠনিক পরিচয় নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি মমতার আবেগপ্রবণ বক্তব্যও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।