কলকাতা, নিউজ ডেস্ক: মোহনবাগান মানেই লড়াই। লড়াইয়ের আরেক নামই মোহনবাগান। সময়টা পক্ষে ছিল না একেবারেই। কয়েক মাস আগে গোল পার্থক্যে হাতছাড়া হয়েছে আইএসএল। এমনকি দিনকয়েক আগেই ডুরান্ড কাপ ফাইনালে ১-৪ গোলে বিধ্বস্ত হতে হয়েছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গলের কাছে। কলকাতা লিগের ডার্বিতেও আটকে দিয়েছিল লাল-হলুদের খুদেরা। কিন্তু দলটার নাম যে মোহনবাগান! সব আক্ষেপ, সব যন্ত্রণা যেন এক টানে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দিয়ে বারাসতে ৮ বছর পর কলকাতা লিগের মুকুট ফিরে পেল গোষ্ঠ পাল সরণির ক্লাব।
১৯১১ সালে যে দল বুট পরা সাহেবদের পর্যদুস্ত করে পরাধীন দেশের বুকে বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছিল, সেই দলের কাছে অসম্ভব বলে কিছু হয় নাকি? শনিবার প্রায় এক দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মহামেডানকে ৩-২ গোলে হারিয়ে ২০১৮ সালের পর ফের কলকাতা লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়াটাও যেন এক প্রকার অসম্ভবকে সম্ভব করাই। যার নেপথ্যে রয়েছে অসংখ্য টুকরো টুকরো লড়াইয়ের গল্প।
শুরুটা অবশ্য প্রত্যাশামতোই দাপুটে। একের পর এক আক্রমণে মহামেডানের রক্ষণকে চাপে ফেলছিল মোহনবাগান। ৯ এবং ১৬ মিনিটে সাহাল আব্দুল সামাদ সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি। তবে ২৬ মিনিটে আর ভুল করেননি। লালিয়ানজ়ুয়ালা ছাংতের মাপা লব করা ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে বল জালে পাঠিয়ে বাগানকে এগিয়ে দেন সাহাল। কিন্তু ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বেশিক্ষণ হাতে থাকেনি। ৪২ মিনিটে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক থেকে লালরেমসাঙ্গার জোরালো শটে সমতা ফেরায় মহামেডান। বিরতির পরেই আরও বড় ধাক্কা অপেক্ষা করছিল সবুজ-মেরুনের জন্য। ৫৯ মিনিটে বক্সের মধ্যে লালরেমসাঙ্গাকে ফেলে দেন গোলকিপার দীপ্রভাত ঘোষ। পেনাল্টির পাশাপাশি সরাসরি লাল কার্ডও দেখেন তিনি। ১০ জনের মোহনবাগানকে আরও চাপে ফেলে ৬৩ মিনিটে পেনাল্টি থেকে মহামেডানকে ২-১ এগিয়ে দেন মহীতোষ রায়।
তার পরেই যেন মাঠে নামে আসল মোহনবাগান। গোলকিপার বদলাতে হল, মাঠে নামলেন সৈয়দ জাহিদ হুসেন বুখারি। একই সময়ে সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ও মাঠে এসে যেন ম্যাচের চেহারা বদলে দিলেন। ৭০ মিনিটে ফের ত্রাতা সাহাল। মনবীরের হেডে নামানো বল মাথা দিয়ে জালে পাঠালেন তিনি। ক্রসবারে লেগে বল গোললাইন পেরিয়ে যায়। ২-২। আর মাত্র ৪ মিনিট পরেই বাগানের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন সম্পূর্ণ করেন সায়ন। সাহালের পাস পেয়ে বক্সের মধ্যে ঢুকে ডান পায়ের জোরালো শটে ডেকাকে পরাস্ত করেন তিনি। ৩-২ এগিয়ে যায় মোহনবাগান। মাত্র ১৪ মিনিটে ১-২ থেকে ৩-২। ১০ জনে নেমে এই প্রত্যাবর্তনই তখন হয়ে ওঠে ম্যাচের সবচেয়ে বড় গল্প।
একদিকে সমতা ফেরাতে মরিয়া মহামেডান। অন্যদিকে এক গোলের লিড আঁকড়ে প্রাণপণে লড়ছে ১০ জনের মোহনবাগান। প্রতিটি আক্রমণে গ্যালারিতে উত্তেজনা, প্রতিটি ক্লিয়ারেন্সে স্বস্তির নিঃশ্বাস। শেষ পর্যন্ত এল সেই কাঙ্ক্ষিত বাঁশি। ৮ বছর পর কলকাতা লিগের ট্রফি ফিরল সবুজ-মেরুন শিবিরে। মাঠে ঢুকে পড়লেন সমর্থকেরা, উড়ল আবির, ফুটবলারদের সঙ্গে গলা মেলাল গোটা গ্যালারি। তার মধ্যেই নেমে এল বৃষ্টি। সেই বৃষ্টিতে ভিজেই চলল উৎসব। সাহালের জোড়া গোল, সায়নের জয়সূচক গোল এবং ১০ জনের অবিশ্বাস্য লড়াই— সব মিলিয়ে বারাসতের বিদ্যাসাগর স্টেডিয়ামে এই সন্ধ্যা শুধু একটি ট্রফি জয়ের স্মৃতি হয়ে রইল না। দীর্ঘ অপেক্ষার পর মোহনবাগানের হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার রাত হিসাবেও থেকে গেল।