ওয়াশিংটন: পারদকে সোনায় পরিণত করা যায়? এক সময় যা ছিল আলকেমির সাধকদের স্বপ্ন, এ বার সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করার দাবি করল আমেরিকার এক প্রযুক্তি সংস্থা। তাদের দাবি, নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে উৎপন্ন নিউট্রন ব্যবহার করে পারদ থেকে তৈরি করা হয়েছে স্থিতিশীল সোনা। শুধু তা-ই নয়, সোনা তৈরির হারে ইউরোপের পরমাণু গবেষণা সংস্থা সিইআরএনের ২০২৫ সালের রেকর্ডকেও ১০ গুণ ছাপিয়ে গিয়েছে তাদের প্রযুক্তি! সান ফ্রান্সিসকোর স্টার্টআপ ‘ম্যারাথন ফিউশন’-এর এই ঘোষণাকে ঘিরে বিজ্ঞানমহলে তৈরি হয়েছে কৌতূহল। তবে কতটা সোনা তৈরি হয়েছে, তার বিশুদ্ধতা কত, কিংবা উৎপাদন খরচই বা কত—সেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও প্রকাশ্যে আসেনি।
গত ২১ অক্টোবর সংস্থাটি এই সাফল্যের কথা ঘোষণা করে। তাদের দাবি, গত মাসে পরীক্ষার মাধ্যমে পারদ থেকে স্থিতিশীল সোনা তৈরিতে সফল হয়েছে তারা। এই পদ্ধতিতে ফিউশন বিক্রিয়া থেকে উৎপন্ন উচ্চশক্তির নিউট্রন ব্যবহার করা হয়। সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় একটি মৌলকে অন্য মৌলে পরিণত করা যায় না। কিন্তু পরমাণুর নিউক্লিয়াসে পরিবর্তন ঘটাতে পারলে এক মৌল থেকে অন্য মৌল তৈরি করা সম্ভব। এই প্রক্রিয়াকেই বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘নিউক্লিয়ার ট্রান্সমিউটেশন’।
কী ভাবে পারদ থেকে সোনা তৈরি হবে?
ম্যারাথন ফিউশনের পদ্ধতির কেন্দ্রে রয়েছে পারদের একটি নির্দিষ্ট আইসোটোপ—মার্কারি-১৯৮। সংস্থার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ফিউশন বিক্রিয়া থেকে উৎপন্ন উচ্চশক্তির নিউট্রন এই পারদের নিউক্লিয়াসে আঘাত করে। তাতে তৈরি হয় মার্কারি-১৯৭ নামে একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ। পরে তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মাধ্যমে সেটি পরিণত হয় গোল্ড-১৯৭-এ। এটিই সোনার স্থিতিশীল আইসোটোপ।
অর্থাৎ, সোনা তৈরির জন্য পারদকে কোনও রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় বদলে দেওয়া হচ্ছে না। বদল ঘটানো হচ্ছে পরমাণুর নিউক্লিয়াসে। এই কারণেই পদ্ধতিটি সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
তবে বৈজ্ঞানিক ভাবে কোনও মৌলকে অন্য মৌলে পরিণত করা সম্ভব হলেও, সেই প্রক্রিয়াকে বাণিজ্যিক ভাবে লাভজনক করে তোলা অত্যন্ত কঠিন। বিপুল শক্তি, উন্নত প্রযুক্তি এবং বিশেষ পরিকাঠামোর প্রয়োজন হয়। তাই পরীক্ষাগারে সোনা তৈরির দাবি আর বাজারে বিক্রির উপযোগী পরিমাণে সোনা উৎপাদন—দু’টি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
সিইআরএনের রেকর্ড কী ছিল?
২০২৫ সালে ইউরোপের পরমাণু গবেষণা সংস্থা CERN-এর বিজ্ঞানীরা তাঁদের লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার বা এলএইচসি-তে সোনার নিউক্লিয়াস তৈরির ঘটনা সামনে এনেছিলেন। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের পরীক্ষায় সিসার পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সংঘর্ষ এড়িয়ে যাওয়ার সময় তৈরি হয়েছিল সোনার নিউক্লিয়াস। সেই পরীক্ষায় উৎপন্ন সোনার মোট পরিমাণ ছিল আনুমানিক ২৯ পিকোগ্রাম অর্থাৎ এক গ্রামের ২৯ লক্ষ কোটি ভাগের এক ভাগেরও কম।
পরিমাণটি এতটাই সামান্য যে তার কোনও বাণিজ্যিক মূল্য ছিল না। তা ছাড়া, সিইআরএনের পরীক্ষায় তৈরি সোনার নিউক্লিয়াস দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়নি। সংঘর্ষযন্ত্রের বিভিন্ন অংশে আঘাত লেগে সেগুলি নষ্ট হয়ে যায়। ম্যারাথন ফিউশনের দাবি, তাদের পদ্ধতিতে সোনা তৈরির হার সিইআরএনের ওই রেকর্ডের তুলনায় ১০ গুণ বেশি। কিন্তু ঠিক কোন পরিমাপের ভিত্তিতে এই তুলনা করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। সংস্থাটি কতটা সোনা তৈরি করেছে, কতগুলি পরমাণু তৈরি হয়েছে কিংবা প্রতি সেকেন্ডে উৎপাদনের হার কত—তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করেনি। ফলে দুই পরীক্ষার ফলাফল সরাসরি তুলনা করাও এখনই সম্ভব নয়।
তা হলে কি সোনার দাম কমে যাবে ?
এই ঘোষণার পর স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, ভবিষ্যতে পরীক্ষাগারে সোনা তৈরি করা সম্ভব হলে আন্তর্জাতিক বাজারে হলুদ ধাতুর দাম কি কমে যাবে? আপাতত সেই সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগের বিশেষ কারণ দেখছেন না বিশেষজ্ঞেরা। কারণ, ম্যারাথন ফিউশনের ঘোষণাকে এখনও বাণিজ্যিক উৎপাদনের সাফল্য বলা যাচ্ছে না।
সংস্থাটি এর আগে একটি গবেষণাপত্রে হিসাব দিয়েছিল, ভবিষ্যতে এক গিগাওয়াট তাপশক্তি উৎপাদনকারী ফিউশন কেন্দ্র থেকে বছরে প্রায় দুই টন সোনা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু সেটি কম্পিউটার মডেল ও তাত্ত্বিক হিসাবের ভিত্তিতে করা অনুমান। বাস্তবে কোনও বাণিজ্যিক ফিউশন কেন্দ্র থেকে এ ভাবে বিপুল পরিমাণ সোনা উৎপাদন করে দেখানো হয়নি।
এখানে আরও একটি বড় বাধা রয়েছে। প্রাকৃতিক পারদের মধ্যে মার্কারি-১৯৮-এর পরিমাণ সীমিত। ফলে এই পদ্ধতিতে উৎপাদন বাড়াতে হলে নির্দিষ্ট আইসোটোপ সংগ্রহ ও পৃথক করার ব্যবস্থাও প্রয়োজন হবে। তৈরি হওয়া সোনার সঙ্গে তেজস্ক্রিয় উপাদান মিশে থাকার আশঙ্কাও রয়েছে। সে ক্ষেত্রে সোনাকে নিরাপদে ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াকরণ এবং দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে।
অন্য দিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার চাহিদা শুধু গয়না তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার সময়ে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার ভূমিকা রয়েছে। ফলে পরীক্ষাগারে সোনা তৈরির একটি প্রযুক্তি আবিষ্কার করলেই বাজারে তার জোগান ও দাম রাতারাতি বদলে যাবে, এমনটা মনে করার কারণ নেই।
সোনা নয়, ফিউশন প্রযুক্তিই সংস্থার মূল লক্ষ্য
ম্যারাথন ফিউশনের মূল কাজ ফিউশন প্রযুক্তির উন্নয়ন। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে সংস্থাটির। সোনা তৈরির পাশাপাশি, ফিউশন থেকে উৎপন্ন নিউট্রন ব্যবহার করে চিকিৎসায় কাজে লাগে এমন তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ তৈরির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে তারা। সংস্থার দাবি, জিঙ্কের উপর নিউট্রন প্রয়োগ করে কপার-৬৪ এবং কপার-৬৭ তৈরির কাজও করেছে তারা। এই আইসোটোপগুলি ক্যানসার নির্ণয় এবং চিকিৎসার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়।
তবে এখানেও স্বাধীন যাচাই জরুরি। সংস্থার ঘোষণাকে চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার আগে পরীক্ষার বিস্তারিত তথ্য, উৎপাদনের পরিমাণ এবং অন্য গবেষণাগারে একই ফল পুনরায় পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা দেখা প্রয়োজন।
পারদ থেকে সোনা তৈরির স্বপ্ন নতুন নয়। বহু শতাব্দী ধরে আলকেমির সাধকেরা সেই চেষ্টাই করেছেন। আধুনিক বিজ্ঞান দেখিয়েছে, পরমাণুর নিউক্লিয়াসে পরিবর্তন ঘটিয়ে এক মৌলকে অন্য মৌলে রূপান্তর করা সম্ভব। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া বাস্তবে কতটা কার্যকর এবং অর্থনৈতিক ভাবে লাভজনক, সেটাই আসল প্রশ্ন।
ম্যারাথন ফিউশনের দাবি সত্য প্রমাণিত হলে তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি হবে। তবে আপাতত সোনা তৈরির ঘোষণাকে বাণিজ্যিক বিপ্লব বলে ধরে নেওয়া যাচ্ছে না। স্বাধীন যাচাই, উৎপাদনের পরিমাণ এবং খরচের হিসাব প্রকাশ্যে আসার পরেই বোঝা যাবে—পারদ থেকে সোনা তৈরির এই প্রযুক্তি সত্যিই কত দূর এগোল।




