নিউ ইয়র্ক: ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ হলে মুসলিমদের কী হবে? তাঁদের কি ভারত থেকে চলে যেতে হবে? রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবতের সামনে সরাসরি এই প্রশ্নই রেখেছিলেন এক মুসলিম ব্যক্তি। আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে সেই প্রশ্নের যে জবাব দিলেন ভাগবত, তা ঘিরে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা—ভারতে মুসলিমদের জায়গা নেই, এমন ধারণা হিন্দুত্বের সঙ্গে যায় না। বরং কোনও হিন্দু যদি মনে করেন, দেশে মুসলিম থাকা উচিত নয়, তা হলে তাঁর সেই ভাবনাই হিন্দুত্বের মূল দর্শনের বিরোধী।
নিউ ইয়র্কে ‘ওয়ান ওয়ার্ল্ড, ওয়ান হিউম্যানিটি’ শীর্ষক এক আন্তঃধর্মীয় অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করছিলেন আরএসএস প্রধান। সেখানেই নিজের পুরনো একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তিনি। ভাগবত জানান, এক বার তাঁর একটি অনুষ্ঠানে কয়েক জন মুসলিম উপস্থিত ছিলেন। বক্তৃতার পর তাঁদের প্রশ্ন ছিল—আরএসএস যখন হিন্দু সংগঠন এবং ‘হিন্দু রাষ্ট্র’-এর কথা বলে, তখন মুসলিমদের অবস্থান কী? তাঁদের কি ভারত ছেড়ে চলে যেতে হবে?
ভাগবতের দাবি, তিনি তখন তাঁদের বলেছিলেন, ‘না, এটাই হিন্দুত্ব নয়।’
কেন নয়? ভাগবতের ব্যাখ্যায়, হিন্দুত্বের ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’। তাঁর মতে, বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষ আলাদা পথে চললেও তাঁদের মধ্যে মানবিক সম্পর্কের জায়গাটি অভিন্ন। তাই কোনও ধর্মের মানুষকে শুধুমাত্র তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বাদ দেওয়ার কথা হিন্দুত্বের দর্শনের সঙ্গে মেলে না।
সেই বক্তব্যের সূত্রেই আরও কড়া মন্তব্য করেন তিনি। ভাগবত বলেন, কোনও হিন্দু যদি মনে করেন, ‘ভারতে মুসলিম থাকা উচিত নয়’, তা হলে তিনি হিন্দু নন। অর্থাৎ, তাঁর বক্তব্যে হিন্দুত্বকে কেবল একটি ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে নয়, বরং একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ধারণা হিসাবেই তুলে ধরা হয়েছে।
নিজের বক্তব্যের পক্ষে একটি ঘটনাও তুলে ধরেন আরএসএস প্রধান। ১৯৯৬ সালে হরিয়ানার দাদরির কাছে বিমান দুর্ঘটনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাঁর দাবি, দুর্ঘটনার পর আরএসএসের স্বয়ংসেবকেরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছিলেন। মৃতদেহ উদ্ধার এবং শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রেও তাঁরা সাহায্য করেছিলেন। কে হিন্দু, কে মুসলিম—সেই পরিচয় না দেখে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো হয়েছিল বলেই দাবি ভাগবতের।
ভাগবতের বক্তব্যে বার বার ফিরে আসে ‘সেবা’-র প্রসঙ্গ। তাঁর দাবি, সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকেরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সমাজসেবার কাজ করেন এবং বিপদের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ান। সেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা করে কাউকে দেখা হয় না।
তবে ভাগবতের এই মন্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ এবং ‘হিন্দুত্ব’ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় রাজনীতিতে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন—হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণায় সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক ও সামাজিক অবস্থান কী হবে? সেই বিতর্কের মধ্যেই বিদেশের মাটিতে আরএসএস প্রধানের এই মন্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করল।
বিশেষ করে তাঁর এই বক্তব্য—‘মুসলিমকে বাদ দেওয়া হিন্দুত্ব নয়’—আরএসএসের হিন্দুত্বের ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। ভাগবতের বক্তব্যে স্পষ্ট, তাঁর ব্যাখ্যায় ভারতীয় সমাজে মুসলিমদের অস্তিত্ব কোনও ‘ব্যতিক্রম’ নয়; বরং তাঁদের বাদ দিয়ে ভারতের সামগ্রিক পরিচয়কেই সম্পূর্ণ করা যায় না।
সঙ্ঘের শতবর্ষ উদ্যাপনের কর্মসূচির অংশ হিসাবেই ভাগবতের আমেরিকা সফর। নিউ ইয়র্কে তাঁর বক্তব্যে তাই শুধু প্রবাসী ভারতীয়দের উদ্দেশে সাংগঠনিক বার্তাই নয়, হিন্দুত্ব এবং ভারতের বহুত্ববাদ নিয়েও একটি রাজনৈতিক-সামাজিক বার্তা উঠে এল। ‘হিন্দু রাষ্ট্র’-এর প্রশ্নের জবাবে ভাগবতের বক্তব্য অন্তত এই জায়গায় স্পষ্ট, ভারত থেকে মুসলিমদের বাদ দেওয়ার ভাবনা তাঁর সংজ্ঞায় হিন্দুত্বের নয়।




