বর্ষার শুরুতে দুশ্চিন্তা ছিল। কখনও বৃষ্টির ঘাটতি, কখনও আবার প্রবল বর্ষণ—দেশের নানা প্রান্তে অসম বৃষ্টির ছবি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু জুলাইয়ে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। বৃষ্টির ঘাটতি পুষিয়ে বর্ষা ফের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছে। কৃষি থেকে গ্রামীণ অর্থনীতি—সব ক্ষেত্রেই এসেছে সাময়িক স্বস্তি। কিন্তু সেই স্বস্তির মধ্যেই ফের উঁকি দিচ্ছে আশঙ্কা। সামনে ‘এল নিনো’। প্রশান্ত মহাসাগরের জলভাগ উষ্ণ হওয়ার এই আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতি আগামী দিনে ভারতের বর্ষাকে কতটা প্রভাবিত করবে, এখন থেকেই শুরু হয়েছে সেই হিসাব।
এ বছরের বর্ষার পূর্বাভাসে শুরু থেকেই অনিশ্চয়তার কথা ছিল। ভারতের আবহাওয়া দফতর জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক বর্ষা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় কম হতে পারে বলে জানিয়েছিল। তার সঙ্গে ছিল এল নিনো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও। ফলে বর্ষা শুরু হওয়ার আগে থেকেই কৃষি এবং জলসম্পদ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে বর্ষার চরিত্র পূর্বাভাসের তুলনায় বেশ কিছুটা আলাদা হয়েছে।
বিশেষ করে জুলাইয়ে বৃষ্টির পরিস্থিতি বদলে যায়। দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠে মৌসুমি বায়ু। যে ঘাটতি নিয়ে বর্ষার প্রথম পর্ব কেটেছিল, তার অনেকটাই পুষিয়ে যায়। ফলে খরিফ মরসুমের চাষেও গতি আসে। ধান, ডাল, তৈলবীজ-সহ বিভিন্ন ফসলের জমিতে প্রয়োজনীয় জলের জোগান মেলে। কৃষি অর্থনীতির কাছে সেটিই ছিল বড় স্বস্তি।
কিন্তু শুধু মোট বৃষ্টির পরিমাণ দিয়ে বর্ষার স্বাস্থ্য বিচার করা যায় না। কোথায়, কখন এবং কতটা বৃষ্টি হল—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ বার সেই জায়গাতেই উদ্বেগ। দেশের এক প্রান্তে অতি বৃষ্টি ও বন্যা, অন্য প্রান্তে দীর্ঘ শুকনো পর্ব—বর্ষার এই অসম বণ্টন কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে জমির ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা যেমন থাকে, তেমনই বৃষ্টির দীর্ঘ বিরতিতে চাষের জমিতে জলাভাব তৈরি হতে পারে।
এর মধ্যেই আবহবিদদের নজর এখন প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে। ‘এল নিনো’ তৈরি হলে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়। এর প্রভাব পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের আবহাওয়ায় পড়তে পারে। ভারতের ক্ষেত্রে এল নিনোর সঙ্গে দুর্বল বর্ষার সম্পর্ক বহু বার দেখা গিয়েছে। যদিও এল নিনো হলেই ভারতে খরা হবে—এমন কোনও অবধারিত নিয়ম নেই।
কারণ ভারতীয় বর্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করে আরও একাধিক প্রাকৃতিক শক্তি। ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রা, ‘ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোল’ বা আইওডি, বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের সৃষ্টি, আরব সাগরের পরিস্থিতি এবং বায়ুপ্রবাহ—সব মিলিয়েই বর্ষার চেহারা তৈরি হয়। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো তৈরি হলেও তার প্রভাব ভারতের মাটিতে ঠিক কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে এই সব ব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্কের উপর।
তবু আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ এল নিনোর প্রভাব যদি আগামী কয়েক মাসে আরও স্পষ্ট হয়, তা হলে বর্ষার শেষ পর্বে বৃষ্টির স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। আর তার প্রভাব শুধু কৃষিক্ষেত্রে আটকে থাকবে না। জলাধারে জলের সঞ্চয়, পানীয় জলের জোগান, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং খাদ্যপণ্যের বাজারেও তার ছায়া পড়তে পারে।
এখন তাই প্রশ্ন, জুলাইয়ের বৃষ্টিতে যে স্বস্তি ফিরেছে, তা কি বর্ষার শেষ পর্যন্ত থাকবে? নাকি প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা ধীরে ধীরে ভারতের বর্ষার উপর চাপ তৈরি করবে? আপাতত উত্তর মেলেনি। বরং এ বছরের বর্ষা ফের মনে করিয়ে দিচ্ছে—মোট বৃষ্টির হিসাবের আড়ালে লুকিয়ে থাকে আরও বড় গল্প। আকাশে মেঘ জমেছে, মাঠে জল এসেছে। কিন্তু আবহাওয়ার পরের অধ্যায়ের দিকে তাকিয়ে এখন থেকেই সতর্ক ভারত।