নিউজ ডেস্ক: আজও মহালয়ার পর থেকেই ময়নাপুর জমিদার বাড়িতে শুরু হয়ে যায় পুজোর প্রস্তুতি। পরিবারের সদস্যরা একে একে ফিরে আসেন নিজেদের পুরনো ভিটেতে। প্রাচীন রীতিনীতি মেনে দেবী বরণের পাশাপাশি পুজোর বিভিন্ন আচার পালন করেন পরিবারের সদস্যরাই। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলালেও ঠাকুরদালানের সেই সাবেকি পরিবেশ, ঢাকের আওয়াজ আর ধূপ-ধুনোর গন্ধ যেন ফিরিয়ে আনে জমিদারি আমলের স্মৃতি। নতুন প্রজন্মের কাছেও এই পুজো হয়ে উঠেছে পরিবারের শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এক বিশেষ উপলক্ষ।
জমিদারি প্রথা নেই, নেই আগের মতো বিপুল আয়োজনও। তবে ময়নাপুরের মুখোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপুজো আজও বহন করে চলেছে কয়েকশো বছরের ইতিহাস ও পারিবারিক ঐতিহ্য। জীর্ণ জমিদার বাড়ির দেওয়াল, পুরনো ঠাকুরদালান আর চণ্ডী মণ্ডপের প্রতিটি কোণ যেন সাক্ষী সেই গৌরবময় অতীতের। তাই এই পুজো শুধু দেবী আরাধনার উৎসব নয়, বরং ময়নাপুরের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং এক পরিবারের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা আবেগেরও এক জীবন্ত দলিল।
বাঁকুড়া জেলার প্রাচীন জনপদগুলির মধ্যে অন্যতম হল জয়পুর ব্লকের ময়নাপুর গ্রাম। বহু প্রাচীন কাল থেকেই এই গ্রাম এলাকার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রামের মর্যাদা পেয়ে আসছে। এই গ্রামকে কেন্দ্র করেই একসময় গড়ে উঠেছিল মুখার্জ্জী পরিবারের জমিদারী। ব্রিটিশ আমলের রমরমে চলা সেই জমিদারীর এখন কনামাত্র অবশিষ্ট নেই। তবু প্রাচীন রীতি মেনে ময়নাপুর জমিদার বাড়ির ঠাকুর দালানে এখনও নিষ্ঠার সাথে পালিত হয় দেবী আরাধনা।
খ্রীষ্টীয় অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের ক্ষমতা ক্রমশ কমতে শুরু করে। ব্রিটিশ শাসকদের চাপিয়ে দেওয়া অতিরিক্ত করের বোঝা টানতে না পেরে মল্ল রাজত্বের একের পর এক তালুকের নিলাম শুরু হয়। আর এই সময়ই জমিদারী শুরু হয় ময়নাপুরের মুখার্জ্জী পরিবারের। বিষ্ণুপুরের শেষ মল্ল রাজা চৈতন্য সিংহের দেওয়ান ছিলেন ময়নাপুরের বাসিন্দা চণ্ডীচরণ মুখোপাধ্যায়। তাঁর আমলেই ১৭৯২ খ্রীষ্টাব্দে ময়নাপুর তালুকের জমিদারী স্বত্ব লাভ করে মুখোপাধ্যায় পরিবার। জমিদারী পত্তনের সাথে সাথে জমিদার বাড়ির ঠাকুর দালানে শুরু হয় দুর্গা পূজা। পরে দুর্গা মন্দির ও চণ্ডী মণ্ডপ সংস্কার করেন ওই পরিবারেরই নিধি কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও তারিণী প্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কথিত আছে সে সময় জমিদারীর একদিনের আয়ে ওই বিশাল চণ্ডী মণ্ডপ ও দুর্গা মন্দির তৈরি হয়েছিল। সে সময় পূজাকে কেন্দ্র করে ধূমধামের সীমা ছিল না। বিশাল জমিদার বাড়ির সদস্য ও তালুকের প্রজায় পূজার চারদিন গমগম করত চণ্ডী মণ্ডপ। যাত্রা পালা, রামায়ন গান এসবের পাশাপাশি চারদিন ধরে চলত ভোজসভা। পূজার সময় গোটা ময়নাপুর গ্রাম ছাড়াও নিমন্ত্রিত থাকত তালুকের প্রজারা। এখন জমিদারী না থাকায় পূজার জৌলুস কমেছে। জীবন জীবিকার তাগিদে দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে জমিদারবাড়ির সদস্যরা। কিন্তু পূজা এলেই ফের তাঁরা ভিড় করেন পুরানো জমিদার বাড়ির জীর্ণ দরদালানে। পূজার সময় বাড়ির লোকেদের অংশ গ্রহনে ফের গমগম করে ওঠে প্লাস্টার খসা দেওয়ালের জমিদার বাড়ি।
