ওয়াশিংটন: ‘রাস্তা থেকে সরে যান, মিস্টার সিংহ! আপনি গাড়ি চালাতেই জানেন না।’ আমেরিকার রাস্তায় ট্রাক চালানো ভারতীয়দের নিয়ে এমনই বার্তা দেওয়া একটি পোস্ট ঘিরে নতুন করে বিতর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। আমেরিকার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দফতর (ডিএইচএস)-এর সমাজমাধ্যমের পাতায় দেওয়া ওই প্রচারপত্রকে ‘বর্ণবিদ্বেষী’, ‘ভারত-বিরোধী’ এবং ‘জাতিগত পরিচয় ধরে নিশানা করার’ অভিযোগ তুলেছে একাধিক মার্কিন সংগঠন।
ডিএইচএস-এর পোস্টটি তৈরি করা হয়েছে জনপ্রিয় ‘ট্রান্সফর্মার্স’ ছবির চরিত্রকে সামনে রেখে। পোস্টারে দেখা যাচ্ছে রোবট চরিত্র ‘অপ্টিমাস প্রাইম’-কে। তার গায়ে রয়েছে ডিএইচএস-এর চিহ্ন। সামনে এক দাড়িওয়ালা বাদামি চামড়ার পুরুষ—মাথায় ব্যান্ডানা। সেই চরিত্রকেই উদ্দেশ করে লেখা হয়েছে, ‘‘Get off our roads, you don't know how to drive, Mr Singh’’। অর্থাৎ, ‘‘আমাদের রাস্তা থেকে সরে যান, আপনি গাড়ি চালাতেই জানেন না, মিস্টার সিংহ।’’
বিতর্কের সূত্র এখানেই। ‘সিংহ’ শুধু কোনও এক ব্যক্তির পদবি নয়। আমেরিকায় বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক শিখের পদবি ‘সিংহ’। হিন্দুদের মধ্যেও এই পদবি প্রচলিত। একই সঙ্গে আমেরিকার ট্রাকিং শিল্পে ভারতীয় বংশোদ্ভূত, বিশেষত শিখ চালকদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। ফলে একটি নির্দিষ্ট পদবিকে সামনে রেখে এই ধরনের সরকারি প্রচারকে নিছক অভিবাসন-বিরোধী প্রচার বলে মানতে নারাজ সমালোচকেরা। তাঁদের বক্তব্য, এর মধ্যে একটি গোটা সম্প্রদায়কে গাড়ি চালানো এবং অভিবাসনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
পোস্টটি প্রকাশ করেছে ডিএইচএস-এর সরকারি এক্স হ্যান্ডল। ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর অভিবাসন নীতির অংশ হিসাবেই এই প্রচার চালানো হচ্ছে। বেআইনি ভাবে আমেরিকায় থাকা বিদেশিদের স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়ার জন্য উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। প্রচারে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘Self-deport or find out’—অর্থাৎ, স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়ুন, নইলে পরিণতির মুখোমুখি হন—এই বার্তা।
শুধু পোস্টারেই থামেনি প্রচার। ডিএইচএস একটি ছোট ভিডিয়োও প্রকাশ করেছে। সেখানে ‘ট্রান্সফর্মার্স’-এর আর এক চরিত্র ‘মেগাট্রন’-কে দেখা যায়। কয়েক জন ট্রাকচালককে নিয়ে ওই ভিডিয়োয় বার্তা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে হরজিন্দর সিংহ, রাজিন্দর কুমার, বেকজান বেইশেকিভ, আখরোর বোজোরভ এবং জসবীর সিংহের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এই চালকদের বিরুদ্ধে দুর্ঘটনা-সহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগের প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে।
ডিএইচএস-এর বক্তব্য, আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা ও ‘Americanism’ রক্ষাই তাদের লক্ষ্য। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, অপরাধে অভিযুক্ত নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তাঁদের নাম ও পরিচয়ের সূত্র ধরে গোটা একটি সম্প্রদায়কে কেন প্রচারের নিশানা করা হবে?
হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, ‘সিংহ’ পদবির মানুষ হিন্দু, শিখ এবং একই সঙ্গে আমেরিকান নাগরিকও। একটি ফেডারেল সংস্থার এমন পোস্টকে তারা ‘বর্ণবিদ্বেষী’ এবং ‘অ্যান্টি-ইন্ডিয়ান প্রোফাইলিং’ বলে অভিযোগ করেছে। সংগঠনটি বিষয়টির তদন্তের দাবিও তুলেছে।
সিখ কোয়ালিশনের অভিযোগও আরও গুরুতর। তাদের বক্তব্য, ৯/১১-র ২৫ বছর পরেও আমেরিকায় চেহারা ও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে শিখদের নিশানা করার প্রবণতা পুরোপুরি শেষ হয়নি। সংগঠনটি মনে করিয়েছে, আমেরিকার লক্ষ লক্ষ শিখের পদবি ‘সিংহ’। সরকারি প্রচারে সেই পরিচয়কে নেতিবাচক ভাবে তুলে ধরা তাই উদ্বেগের বিষয়।
ঘটনাটিকে আরও বিদ্রূপাত্মক করে তুলেছে প্রচারের চরিত্র নির্বাচন। আমেরিকার প্রতীক হিসাবে যে রোবটকে দেখানো হয়েছে, ‘ট্রান্সফর্মার্স’-এর গল্পে সেই চরিত্রও আসলে ভিন্গ্রহের প্রাণী—অর্থাৎ ‘এলিয়েন’। অভিবাসীদের ‘এলিয়েন’ বলে চিহ্নিত করার সরকারি ভাষ্যের সঙ্গে জনপ্রিয় সংস্কৃতির চরিত্রকে মিশিয়ে দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এরই মধ্যে ডিএইচএস-এর ‘CBP Home’ কর্মসূচিকে সামনে রেখে স্বেচ্ছায় আমেরিকা ছাড়ার জন্য বেআইনি অভিবাসীদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। ডিএইচএস-এর তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচির আওতায় যোগ্য ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার ইচ্ছা নথিভুক্ত করতে পারেন। যাত্রার জন্য সহায়তার পাশাপাশি ২,৬০০ ডলার পর্যন্ত ‘এক্সিট বোনাস’-এর কথাও বলা হয়েছে।
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কড়া বার্তা দেওয়ার লক্ষ্যেই যে প্রচার, তা স্পষ্ট। কিন্তু সেই প্রচারে ‘মিস্টার সিংহ’কে সামনে রেখে ভারতীয় ও শিখ পরিচয়কে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তাতেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন কি এবার গোটা একটি সম্প্রদায়কেই সন্দেহের চোখে দেখানোর পথে হাঁটছে?