মুম্বই: মুম্বইয়ের লোকাল ট্রেন। শহরের লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে কর্মস্থলে পৌঁছনোর প্রধান ভরসা। প্রতিদিন ভিড় ঠেলে ট্রেনে ওঠা, দরজার কাছে কোনও রকমে দাঁড়িয়ে থাকা, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছনো—এই লড়াই যেন নিত্যযাত্রীদের জীবনেরই অংশ। কিন্তু সেই যাত্রাপথেই যদি এক দিন মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়? যদি সামান্য ভুলেই ঘটে যেতে পারত ভয়াবহ দুর্ঘটনা? মুম্বইয়ের যুবক তেজস যোশীর জীবনে তেমনই একটি ঘটনা বদলে দিয়েছে প্রতিদিনের যাতায়াতের হিসাব।
লোকাল ট্রেনে ওঠার সময় অল্পের জন্য বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন, আর নয়। নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তির জন্য কর্মস্থলের কাছাকাছি বাড়ি ভাড়া নেবেন। সেই সিদ্ধান্তের জেরে আগের তুলনায় প্রায় ছ’গুণ বেশি বাড়িভাড়া দিতে হচ্ছে তাঁকে। তবু তাতে আপত্তি নেই। কারণ, তাঁর কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি—প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করতে না হওয়া।
ভিড়ের মধ্যে পা পিছলে বিপত্তি
সমাজমাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তেজস লিখেছেন, টানা দু’বছর বদলাপুর থেকে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ টার্মিনাস (সিএসএমটি) পর্যন্ত লোকাল ট্রেনে যাতায়াত করতেন তিনি। সেখান থেকে ট্যাক্সি ধরে পৌঁছতেন নারিম্যান পয়েন্টে, কর্মস্থলের এলাকায়। তার আগে প্রায় তিন বছর বদলাপুর থেকে আন্ধেরি পর্যন্ত যাতায়াত করেছেন।
দীর্ঘদিনের এই যাত্রাপথে লোকাল ট্রেনের ভিড় তাঁর কাছে নতুন কিছু ছিল না। কিন্তু ব্যস্ত সময়ে বদলাপুর স্টেশনে সিএসএমটি-গামী একটি লোকাল ট্রেনে ওঠার সময় ঘটে যায় বিপত্তি।
ভিড়ের মধ্যে ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে প্ল্যাটফর্মে পা পিছলে যায় তাঁর। মুহূর্তের জন্য ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন তেজস। অল্পের জন্য প্ল্যাটফর্ম ও রেললাইনের মাঝের ফাঁকে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পান। শারীরিক ভাবে বড় কোনও আঘাত না পেলেও ঘটনাটি গভীর ভাবে নাড়া দেয় তাঁকে। বিপদটা যে কতটা কাছে চলে এসেছিল, তা উপলব্ধি করতে বেশি সময় লাগেনি। প্রতিদিনের যাতায়াতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঝুঁকিকে আর স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি। এর পরেই সিদ্ধান্ত—লোকাল ট্রেনে রোজ যাতায়াতের অধ্যায় শেষ।
বাড়িভাড়া ছ’গুণ, তবু স্বস্তি
লোকাল ট্রেনের উপর নির্ভরতা কমাতে কর্মস্থলের কাছাকাছি বাড়ি খুঁজতে শুরু করেন তেজস। শেষ পর্যন্ত ভিখরোলিতে থাকার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। নতুন বাড়ির ভাড়া আগের তুলনায় প্রায় ছ’গুণ বেশি। যাতায়াতের জন্যও এখন বাইক অথবা ক্যাব ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছেন তিনি। স্বাভাবিক ভাবেই বেড়েছে মাসিক খরচ। কিন্তু সেই বাড়তি খরচের বিনিময়ে মানসিক স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন তেজস।
তাঁর কথায়, লোকাল ট্রেন থেকে পড়ে যাওয়ার দুঃস্বপ্ন তাঁকে তাড়া করত। এখন কর্মস্থলের কাছে থাকার ফলে দীর্ঘ যাত্রার চাপ কমেছে, সেই সঙ্গে কমেছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে দুশ্চিন্তাও। তবে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানাতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও স্বীকার করেছেন তিনি। এমন ভাবে বাড়ি বদলানোর সামর্থ্য সবার নেই। মুম্বইয়ের বহু মানুষ দূরের শহরতলিতে থাকেন, কারণ কর্মস্থলের কাছাকাছি বাড়িভাড়া তাঁদের সাধ্যের বাইরে। তাঁদের কাছে লোকাল ট্রেন ছাড়া বিকল্পও সীমিত।
‘যাতায়াতের জন্য জীবন বাজি রাখা উচিত নয়’
তেজসের সমাজমাধ্যমের পোস্ট ঘিরে শুরু হয়েছে আলোচনা। তাঁর বক্তব্য, যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে, তাঁদের নিজেদের নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। শুধুমাত্র খরচ বাঁচানোর জন্য প্রতিদিন বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে যাতায়াত চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন কি না, তা ভেবে দেখা দরকার। তবে এই পরামর্শের বাস্তব সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
কর্মস্থলের কাছাকাছি বাড়ি ভাড়া নেওয়া মানেই শুধু বেশি ভাড়া দেওয়া নয়, অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য খরচও বেড়ে যাওয়া। ফলে তেজসের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ অনেকেরই নেই। তাঁদের কাছে দীর্ঘ যাত্রা কোনও পছন্দ নয়, বরং আর্থিক পরিস্থিতির কারণে বাধ্যবাধকতা। সমাজমাধ্যমে একাধিক যাত্রী নিজেদের অভিজ্ঞতাও ভাগ করে নিয়েছেন। এক যাত্রীর দাবি, ভিড় এড়াতে তিনি ভিখরোলি স্টেশন থেকে ট্রেনে ওঠেন। তবু ঠেলাঠেলিতে তাঁর কুর্তা ছিঁড়ে গিয়েছিল। তাঁর কথায়, সেই পরিস্থিতিতে যাত্রীদের ব্যক্তিগত পরিসর ও মর্যাদা যেন কোনও গুরুত্বই পায় না।
অন্য এক ব্যক্তি নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় ডোম্বিভলি থেকে নারিম্যান পয়েন্ট পর্যন্ত পাঁচ বছর যাতায়াতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, সেই কঠিন যাতায়াতই তাঁকে আরও পরিশ্রম করে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিয়েছিল। আবার কেউ কেউ বলেছেন, শুধু টাকা বাঁচানোর জন্য মানুষের প্রতিদিনের জীবনকে অসহনীয় করে তোলা উচিত নয়। কাজের জায়গায় পৌঁছতে কতটা সময়, পরিশ্রম ও মানসিক চাপ সহ্য করতে হচ্ছে, সেটাও জীবনযাত্রার মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
মুম্বইয়ের ‘লাইফলাইন’, কিন্তু নিরাপত্তা কতটা?
মুম্বইয়ের শহরতলির রেল পরিষেবা লক্ষ লক্ষ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শহরের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলিতে কাজ করতে আসা মানুষের কাছে লোকাল ট্রেন তুলনামূলক সাশ্রয়ী পরিবহণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কিন্তু ব্যস্ত সময়ে বিপুল যাত্রীর চাপ, ট্রেনে ওঠানামার তাড়াহুড়ো এবং অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
প্রতিদিনের যাত্রীরা জানেন, ট্রেন ছাড়ার আগে কোনও রকমে কামরায় উঠে পড়তে পারলেই যেন বড় স্বস্তি। অনেক সময় দরজার কাছে ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে যাত্রা করতে হয়।
এমন পরিস্থিতিতে সামান্য ভারসাম্য হারানোও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তেজসের অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতাকেই ব্যক্তিগত জীবনের গল্পের মাধ্যমে সামনে এনেছে। তবে কর্মস্থলের কাছে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রত্যেকের পক্ষে সম্ভব নয়। শহরের কাছাকাছি বাড়িভাড়া অনেকের আয়ের তুলনায় অত্যন্ত বেশি। ফলে নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ যাতায়াতের ইচ্ছা থাকলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বহু মানুষকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়।
ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের আড়ালে বড় প্রশ্ন
তেজস নিজের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী বিকল্প বেছে নিতে পেরেছেন। কিন্তু যাঁদের সেই সুযোগ নেই, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু ব্যক্তির উপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। কারণ, লোকাল ট্রেন মুম্বইয়ের মানুষের জীবনরেখা। সেই জীবনরেখায় যাত্রা করতে গিয়ে কাউকে যেন নিজের জীবন বাজি রাখতে না হয়। তাঁর সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা, আবার রয়েছে শহরের জীবনযাত্রার খরচ ও গণপরিবহণের নিরাপত্তা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নও।
কর্মস্থলের কাছে বাস করলে যাতায়াতের সময় ও ঝুঁকি কমতে পারে, কিন্তু তার জন্য যে বাড়তি খরচ করতে হয়, তা সবার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। তাই যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রেল পরিষেবায় ভিড় নিয়ন্ত্রণ, পরিকাঠামোর উন্নতি এবং নিরাপদে ওঠানামার ব্যবস্থা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসছে। ভিড়ের মধ্যে এক মুহূর্তের দুর্ঘটনা তেজসকে বুঝিয়ে দিয়েছে, প্রতিদিনের যাতায়াতকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া আর তাকে নিরাপদ বলে ধরে নেওয়া এক বিষয় নয়। তাঁর খরচ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি এখন নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু কে কত বাড়িভাড়া দিতে পারছেন, তা নয়। প্রশ্ন হল, কাজ করতে যাওয়ার মতো দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে কাউকে কেন এমন বিপদের মুখোমুখি হতে হবে? শহরের গতি বজায় রাখতে গিয়ে যাত্রীদের নিরাপত্তা যেন পিছনের সারিতে চলে না যায়—তেজসের অভিজ্ঞতা সেই বার্তাই আরও এক বার সামনে আনল।




