পটনা: সরকারি নথিতে মাসিক বেতন ৪৬ হাজার টাকা। অথচ সেই বেতনই বেড়ে দাঁড়াল প্রায় ৫ লক্ষ টাকা! কোথাও আবার অস্তিত্বহীন শিক্ষকের নামে মাসের পর মাস ঢুকেছে সরকারি টাকা। বিহারের শিক্ষা দফতরের বেতন ব্যবস্থায় এমনই একাধিক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসতেই তোলপাড় শুরু হয়েছে রাজ্য প্রশাসনে। সরকারি পোর্টালে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ, বেতনের অঙ্কে কারচুপি এবং ভুয়ো শিক্ষকের পরিচয়ে টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ ঘিরে শুরু হয়েছে তদন্ত। নবদা, পটনা ও ভাগলপুর—তিন জেলায় প্রায় ১ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকার কথিত অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। ইতিমধ্যেই একাধিক আধিকারিককে সাসপেন্ড করা হয়েছে। এবার রাজ্যের ৩৮টি জেলাতেই বেতন সংক্রান্ত নথি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিহার সরকার।
৪৬ হাজারের বেতন কী ভাবে প্রায় ৫ লক্ষ?
নবদা জেলার একটি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকের বেতন সংক্রান্ত নথিতে কারচুপির অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ, ওই শিক্ষকের অনুমোদিত মাসিক মোট বেতন ছিল ৪৬,৭৭২ টাকা। কিন্তু সরকারি এইচআরএমএস পোর্টালে সেই অঙ্ক বাড়িয়ে করা হয় ৪,৯১,৭৭২ টাকা। বেতনের সঙ্গে অননুমোদিত ভাতা যোগ করেই এই অঙ্ক বাড়ানো হয়েছিল বলে অভিযোগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে ওই শিক্ষকের অনুমোদিত বেতনের তুলনায় অনেক বেশি টাকা দেওয়া হয়। পাশাপাশি, সমগ্র শিক্ষা প্রকল্পের তহবিল থেকে তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রায় ২.৮৬ লক্ষ টাকা পাঠানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ। সব মিলিয়ে ওই শিক্ষকের নামে ১০,৪৩,৯৫০ টাকা অননুমোদিত ভাবে দেওয়া হয়েছে বলে এফআইআরে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ঘটনায় বেতন সংক্রান্ত তথ্য নথিভুক্ত করার দায়িত্বে থাকা এক কর্মী এবং তা যাচাই করার দায়িত্বে থাকা আধিকারিকের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গত ১৩ অক্টোবর নবদা টাউন থানায় এফআইআর দায়ের করা হয়। কী ভাবে বেতনের অঙ্কে এত বড় পরিবর্তন ঘটল, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
পটনায় সরকারি লগইন ব্যবহার করে টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ
পটনা জেলাতেও সরকারি বেতন ব্যবস্থার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। গুলজারবাগের এফএনএস অ্যাকাডেমির ক্লার্ক বিজয় কুমার বিদ্যার্থীকে ১৪ অক্টোবর সাসপেন্ড করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি ও দফতরীয় তহবিলের প্রায় ৭৬.৭২ লক্ষ টাকার আর্থিক অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ, জেলা শিক্ষা আধিকারিকের সরকারি ‘মেকার’ লগইন আইডি ব্যবহার করে অনুমতি ছাড়াই পোর্টালে তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছিল। সেই প্রক্রিয়ায় অননুমোদিত অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা করা হয় বলেও অভিযোগ। সরকারি বেতন ব্যবস্থায় একাধিক স্তরে যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কী ভাবে এই ধরনের অনিয়ম সম্ভব হল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, সংশ্লিষ্ট লগইন ব্যবহারের অনুমতি কার কাছে ছিল এবং অর্থপ্রদানের আগে প্রয়োজনীয় যাচাই করা হয়েছিল কি না।
ভাগলপুরে ভুয়ো শিক্ষিকার নামে ৯৮ লক্ষ টাকা!
ভাগলপুরের ঘটনায় আরও বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সেখানে তনুশ্রী নামে এক কথিত ভুয়ো শিক্ষিকার পরিচয়ে সরকারি পোর্টালের মাধ্যমে ৯৮,১২,৭৭৩ টাকা অননুমোদিত ভাবে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ।
এই ঘটনায় ভাগলপুরের জেলা শিক্ষা আধিকারিক চন্দন কুমার এবং জেলা কর্মসূচি আধিকারিক শশী চন্দন চৌধুরীকে সাসপেন্ড করা হয়েছে।
তদন্তে এক চুক্তিভিত্তিক কম্পিউটার অপারেটরের ভূমিকাও সামনে এসেছে। অভিযোগ, ভুয়ো পরিচয়ে তৈরি শিক্ষকের আইডি ব্যবহার করে একাধিক মাস ধরে বেতনের টাকা পাঠানো হয়েছিল। গত ৮ অক্টোবর বিষয়টি নিয়ে মামলা দায়ের হয়। পর দিন গ্রেফতার করা হয় শশী চন্দন চৌধুরীকে। পরে বিভাগীয় পদক্ষেপ করা হয় সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে।
কী ভাবে কাজ করে বেতনের অনলাইন ব্যবস্থা?
বিহারে সরকারি কর্মীদের বেতন সংক্রান্ত বিল তৈরি ও যাচাইয়ের জন্য ব্যবহার করা হয় হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা এইচআরএমএস পোর্টাল। এই ব্যবস্থায় সাধারণত তিনটি স্তরে কাজ হয়—‘মেকার’, ‘চেকার’ এবং ‘অ্যাপ্রুভার’।
প্রথম স্তরে বেতন সংক্রান্ত তথ্য নথিভুক্ত করা হয়। দ্বিতীয় স্তরে তা যাচাই করা হয়। তৃতীয় স্তরে অনুমোদনের পরে কমপ্রিহেনসিভ ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা সিএফএমএসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হয়।
অভিযোগ, এই একাধিক স্তরের যাচাই থাকা সত্ত্বেও বেতনের অঙ্ক বদলে দেওয়া, অনুমতি ছাড়া তথ্য নথিভুক্ত করা এবং ভুয়ো পরিচয়ে অর্থপ্রদানের মতো ঘটনা ঘটেছে। ফলে শুধু ব্যক্তিগত জালিয়াতি নয়, সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং নজরদারির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ছয় লক্ষেরও বেশি কর্মীর বেতন যাচাই
ঘটনার পর বিহারের অর্থ দফতর শিক্ষা দফতরের আধিকারিক, শিক্ষক এবং অশিক্ষক কর্মীদের বেতন ও ভাতা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছে। পরবর্তী মাসের বেতন ছাড়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নথি যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বেতন প্রক্রিয়াকরণের যে কোনও পর্যায়ে অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ‘মেকার’, ‘চেকার’ বা ‘অ্যাপ্রুভার’-এর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া হয়ে থাকলে তা ফেরত আদায়ের কথাও বলা হয়েছে।
বিহারের শিক্ষা দফতরের অধীনে ছয় লক্ষেরও বেশি শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মী রয়েছেন। ফলে ব্যাপক হারে নথি যাচাই করতে গিয়ে বেতন প্রদানে দেরি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে অনিয়মের অভিযোগে যাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তাঁদের ক্ষেত্রে নিয়ম মেনেই পদক্ষেপ করার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।
৩৮টি জেলায় অডিট, নজরে বেতন ব্যবস্থার নিরাপত্তা
বিহারের শিক্ষামন্ত্রী মিথিলেশ তিওয়ারি জানিয়েছেন, রাজ্যের ৩৮টি জেলাতেই অডিটের কাজ চলছে। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে সেই কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনলাইন বেতন ব্যবস্থায় যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, তার জন্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সরকারি বেতন ব্যবস্থায় জালিয়াতির এই অভিযোগ শুধু অর্থের অপচয় নয়, প্রশাসনিক নজরদারির কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। অনুমোদিত বেতন কী ভাবে কয়েক গুণ বেড়ে গেল, ভুয়ো পরিচয়ে কী ভাবে সরকারি টাকা পাঠানো হল এবং একাধিক স্তরের যাচাই থাকা সত্ত্বেও কেন অনিয়ম ধরা পড়ল না—এখন সেই প্রশ্নগুলিরই উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
পূর্ণাঙ্গ অডিট ও তদন্তের ফলেই স্পষ্ট হবে, এই আর্থিক অনিয়মের পরিধি কতটা এবং এর পিছনে আর কারা জড়িত। আপাতত বিহার সরকারের লক্ষ্য, বেতন ব্যবস্থার ফাঁকফোকর বন্ধ করে সরকারি অর্থের অপব্যবহার রোখা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।




