নয়াদিল্লি: আফ্রিকা থেকে চিতা এনে ভারতে তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ ‘প্রজেক্ট চিতা’ ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ। এ বার আর রোগ বা স্বাভাবিক কারণে নয়, আগ্নেয়াস্ত্রের ছররার আঘাতে মৃত্যু হল মধ্যপ্রদেশের কুনো জাতীয় উদ্যানের একটি ১৯ মাসের পুরুষ চিতার। নির্ভার নামে এক স্ত্রীচিতার সন্তান KNG22-কে গুরুতর জখম অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল মোরেনা জেলার জঙ্গল থেকে। চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচার করে তার শরীর থেকে পাঁচটি ছররা বের করলেও শেষরক্ষা হয়নি। মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, মৃত্যু হয় শাবকটির। ভারতে নতুন করে চিতা ফিরিয়ে আনার প্রকল্প শুরুর পর এই প্রথম কোনও চিতার গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা সামনে এল। ঘটনায় বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা এবং সংরক্ষিত এলাকার বাইরের জঙ্গলে নজরদারি নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনার গুরুত্ব বুঝে তদন্তে নেমেছে রাজ্য ও কেন্দ্র—দু’পক্ষই। মধ্যপ্রদেশ সরকার বন ও পুলিশ আধিকারিকদের নিয়ে বিশেষ তদন্তকারী দল বা এসটিএফ গঠন করেছে। বুধবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকও তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কেন্দ্রীয় দল পাঠানোর কথা জানিয়েছে। জাতীয় ব্যাঘ্র সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ (এনটিসিএ), বন্যপ্রাণ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ব্যুরো (ডব্লিউসিসিবি)-র আধিকারিকেরা ওই দলে রয়েছেন। কী ভাবে চিতাটির মৃত্যু হল, কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও গাফিলতি ছিল কি না—সব দিক খতিয়ে দেখবে তারা।
জঙ্গল থেকে উদ্ধার, তার পর অস্ত্রোপচার
বন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২৫ অক্টোবর মোরেনা জেলার আঞ্চলিক বনাঞ্চলে আহত অবস্থায় KNG22-কে দেখতে পান নজরদারির দায়িত্বে থাকা কর্মীরা। এলাকাটি কুনো জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত সীমানার বাইরে, শেওপুর ও মোরেনা অঞ্চলের জঙ্গল-সংলগ্ন এলাকায়। খবর পেয়েই উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। আহত চিতাটিকে প্রথমে কুনোয় নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসার জন্য। পরে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনে তাকে জবলপুরের পশুচিকিৎসা কেন্দ্রে স্থানান্তরিত করা হয়।
প্রথমে এক্স-রে এবং পরে সিটি স্ক্যানে চিতাটির শরীরে একাধিক অস্বাভাবিক বস্তু ধরা পড়ে। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন, সেগুলি আগ্নেয়াস্ত্রের ছররা। জরুরি অস্ত্রোপচারে পাঁচটি ছররা বের করা হয়। কিন্তু তত ক্ষণে শরীরের ভিতরে গুরুতর ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকদের রিপোর্ট অনুযায়ী, ছররার আঘাতে তার অভ্যন্তরীণ অঙ্গ, পেশি ও স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। চিকিৎসা চালিয়েও তাকে বাঁচানো যায়নি।
শিকার, না কি আতঙ্কে গুলি?
চিতাটিকে কেন গুলি করা হয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তদন্তকারীরা শিকারের সম্ভাবনা যেমন খতিয়ে দেখছেন, তেমনই জঙ্গলে চিতার উপস্থিতি দেখে কেউ আতঙ্কিত হয়ে গুলি চালিয়েছিলেন কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। স্থানীয় এলাকায় দেশি বন্দুকের ব্যবহার এবং দুর্গম জঙ্গল-খাতের বিস্তীর্ণ এলাকা নজরদারির ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত ঘটনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছননি তদন্তকারীরা। কাউকে গ্রেফতারের খবরও সামনে আসেনি।
চিতাটি কুনোর নজরদারি ব্যবস্থার আওতায় ছিল এবং তার গায়ে রেডিয়ো কলারও লাগানো ছিল বলে জানা গিয়েছে। ফলে তার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু অবস্থান জানা আর বিপদ ঠেকানো এক বিষয় নয়—এই ঘটনাই সেই সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনে দিয়েছে। চিতা সংরক্ষিত এলাকা ছেড়ে আশপাশের আঞ্চলিক জঙ্গলে চলে গেলে একাধিক বন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়, দ্রুত উদ্ধার এবং স্থানীয় স্তরে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
আগেও শিকারিদের নিয়ে উদ্বেগ
মোরেনা ও কুনো-সংলগ্ন জঙ্গল এলাকায় বন্যপ্রাণী শিকার নিয়ে এর আগেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চলতি বছর ওই বৃহত্তর অঞ্চলে একাধিক চিতাবাঘ হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন শিকারচক্রের বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। ফলে KNG22-এর মৃত্যু বিচ্ছিন্ন ঘটনা, না কি বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তার আরও গভীর সমস্যার ইঙ্গিত—তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রজেক্ট চিতার প্রাথমিক সুরক্ষা পরিকল্পনায় দেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ফাঁদ, বিষ প্রয়োগ এবং বিদ্যুতের তারের মতো বিপদের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
নজরদারি বাড়ানো, বনকর্মীদের টহল জোরদার করা, স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সন্দেহজনক গতিবিধির উপর নজর রাখার মতো ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু কুনোর বাইরে চিতার বিচরণক্ষেত্র যত বিস্তৃত হচ্ছে, নিরাপত্তার দায়িত্বও তত জটিল হয়ে উঠছে। শুধু জাতীয় উদ্যানের ভিতরে নজরদারি চালালেই যে হবে না, এই ঘটনা সেই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট করেছে।
কেন্দ্রের নজরে প্রজেক্ট চিতা
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে নামিবিয়া থেকে চিতা এনে ভারতে পুনর্বাসনের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। পরে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেও চিতা আনা হয়। দীর্ঘ কয়েক দশক আগে ভারতে চিতা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পর তাদের ফিরিয়ে আনার এই প্রকল্পকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু নতুন পরিবেশে তাদের মানিয়ে নেওয়া, বংশবৃদ্ধি, রোগের ঝুঁকি এবং নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে প্রকল্পটিকে।
KNG22-এর মৃত্যু সেই চ্যালেঞ্জের তালিকায় আরও একটি গুরুতর প্রশ্ন যোগ করল। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী দল ঘটনার পরিস্থিতি, উদ্ধার ও চিকিৎসার নথি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা খতিয়ে দেখবে। মধ্যপ্রদেশের বিশেষ তদন্তকারী দলের সঙ্গেও সমন্বয় করে কাজ করবে তারা। তদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ স্থির করা হবে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, রেডিয়ো কলার পরিয়ে নজরদারিতে রাখা একটি চিতা কী ভাবে গুলিবিদ্ধ হল? সংরক্ষিত অরণ্যের বাইরে তার নিরাপত্তার দায়িত্ব কার, আর এমন ঘটনা আটকাতে নজরদারির কোন ফাঁকগুলি বন্ধ করা জরুরি? KNG22-এর মৃত্যু শুধু একটি বন্যপ্রাণীর প্রাণহানির ঘটনা নয়; ভারতের চিতা পুনর্বাসন প্রকল্পে নিরাপত্তা ও সংরক্ষণের ব্যবস্থাকে নতুন করে যাচাই করারও পরীক্ষা।




