নিউজ ডেস্ক: গুহার ভিতর চুনাপাথর কাটার কাজ চলছিল। মাটি সরাতে গিয়ে কয়েকটি অদ্ভুত হাড়ের টুকরো চোখে পড়েছিল শ্রমিকদের। হাড়গুলি দেখতে মানুষের মতো, আবার পুরোপুরি মানুষেরও নয়। গুরুত্ব বুঝতে না পেরে কিছু হাড় গুহার বাইরে ফেলে দিয়েছিলেন তাঁরা। তখন কে জানত, সেই ‘অদ্ভুত’ হাড়ই কয়েক হাজার বছর আগের মানব-ইতিহাসের এক অজানা অধ্যায়ের দরজা খুলে দেবে!
সময়টা ১৮৫৬ সালের অগস্ট। জায়গা জার্মানির নীয়ান্ডার উপত্যকা। চুনাপাথর তোলার জন্য ছোট একটি গুহার ভিতরের মাটি ও পলিমাটি সরাচ্ছিলেন শ্রমিকেরা। সেখান থেকেই উদ্ধার হয় মাথার খুলির একটি অংশ এবং শরীরের আরও বেশ কয়েকটি হাড়। প্রথমে সেগুলিকে গুহাভালুকের হাড় বলে মনে করা হয়েছিল। কিছু হাড় ফেলে দেওয়াও হয়েছিল। পরে স্থানীয় শিক্ষক ও প্রকৃতিবিদ ইয়োহান কার্ল ফুহলরট হাড়গুলি পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন, এগুলি কোনও পশুর নয়—মানুষেরই দেহাবশেষ।
কিন্তু আসল রহস্য তখনও বাকি। হাড়গুলি মানুষের হলেও তাদের গঠন ছিল অস্বাভাবিক। মাথার খুলিতে প্রকট ভ্রূ-অস্থি, অপেক্ষাকৃত নিচু ও লম্বাটে খুলি এবং আরও কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তৎকালীন বিজ্ঞানীদের কাছে পরিচিত মানুষের কঙ্কালের সঙ্গে সহজে মেলেনি। ফলে প্রশ্ন উঠল—এ কি কোনও অস্বাভাবিক গঠনের আধুনিক মানুষ, নাকি মানব-ইতিহাসের একেবারে অন্য কোনও শাখার প্রতিনিধি?
১৮৫৭ সালে ফুহলরট ও তাঁর সহযোগী হার্মান শাফহাউজেন আবিষ্কারটির বৈজ্ঞানিক বিবরণ প্রকাশ করেন। পরবর্তী কয়েক বছরে এই কঙ্কালকে ঘিরে তীব্র বৈজ্ঞানিক বিতর্ক শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত ১৮৬৪ সালে এই মানবগোষ্ঠীকে নতুন প্রজাতি হিসেবে Homo neanderthalensis নাম দেওয়া হয়। আবিষ্কৃত কঙ্কালটি পরিচিত হয় Neanderthal 1 বা Feldhofer 1 নামে।
আরও চমকপ্রদ তথ্য পরে সামনে আসে। আধুনিক গবেষণায় সরাসরি রেডিয়োকার্বন ডেটিংয়ের মাধ্যমে Neanderthal 1-এর বয়স প্রায় ৪০ হাজার বছর বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ ১৮৫৬ সালে শ্রমিকদের হাতে উঠে আসা সেই হাড়গুলি ছিল মানুষের অতীতের এক সুদূর অধ্যায়ের সাক্ষী।
তবে ১৮৫৬ সালের আবিষ্কারের গল্প সেখানেই শেষ হয়নি। চুনাপাথর কাটার কাজে মূল গুহাটির বড় অংশই ধ্বংস হয়ে যায়। গুহার ঠিক কোথায় দেহাবশেষগুলি ছিল, সেই তথ্যও ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। এমনকি উনিশ শতকের শেষের দিকে মূল গুহাটির সঠিক অবস্থানও আর নিশ্চিত ভাবে জানা যাচ্ছিল না। ফলে গবেষকদের কাছে বড় প্রশ্ন ছিল—সেই গুহায় কি শুধু Neanderthal 1-এর দেহাবশেষই ছিল?
উত্তর মিলতে শুরু করে প্রায় দেড়শো বছর পর
১৯৯৭ সালে গবেষকেরা পুরনো নথি ও ঐতিহাসিক তথ্য ঘেঁটে সেই গুহা থেকে সরিয়ে ফেলা পলিমাটির সম্ভাব্য অবস্থান চিহ্নিত করেন। শুরু হয় নতুন করে খনন। আর সেখানেই মেলে বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ—প্যালিওলিথিক যুগের নানা নিদর্শন, পশুর দেহাবশেষ এবং মানুষের হাড়ের টুকরো।
সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিষ্কারগুলির একটি ছিল মানুষের একটি ছোট হাড়ের টুকরো। সেটি পরীক্ষা করে দেখা যায়, তা Neanderthal 1-এর পায়ের হাড়ের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। অর্থাৎ ১৮৫৬ সালে গুহা থেকে উদ্ধার হওয়া কঙ্কালের আরও একটি অংশ বহু বছর পর আবিষ্কৃত হয়েছিল।
নতুন খননে মোট ২৪টি মানুষের হাড়ের টুকরো উদ্ধার হয়। সেগুলির মধ্যে কিছু Neanderthal 1-এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা যায়। আবার বেশ কয়েকটি টুকরোয় নিয়ানডারথালদের স্বতন্ত্র শারীরিক বৈশিষ্ট্যও দেখা যায়। গবেষকদের সিদ্ধান্ত—এই নমুনাগুলিতে অন্তত তিন জন নিয়ানডারথালের উপস্থিতির প্রমাণ রয়েছে।
পরবর্তী গবেষণায় শুধু হাড়ের গঠন নয়, জেনেটিক তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি পৃথক নিয়ানডারথাল দেহাবশেষ থেকে পাওয়া মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ অন্য নিয়ানডারথালদের জেনেটিক তথ্যের সঙ্গে মিল দেখায়। অর্থাৎ কঙ্কালের গঠন, বয়স নির্ধারণ এবং জেনেটিক বিশ্লেষণ—তিন দিক থেকেই আবিষ্কারটির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়।
১৮৫৬ সালে অবশ্য এসবের কিছুই জানা ছিল না। শ্রমিকদের কাছে সেগুলি ছিল গুহার মাটির মধ্যে পাওয়া কয়েকটি অদ্ভুত হাড় মাত্র। সেই কারণেই আবিষ্কারের সময় অনেক হাড় যথাযথ ভাবে সংরক্ষণ বা নথিবদ্ধও করা হয়নি। আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মতো স্তর, অবস্থান বা আশপাশের বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তখন সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। পরে গবেষকদের সেই হারানো তথ্যের অনেকটাই পুনর্গঠন করতে হয়েছে।
আর সেই কারণেই Neanderthal 1-এর গল্প শুধু একটি প্রাচীন কঙ্কাল আবিষ্কারের গল্প নয়। এটি বিজ্ঞান কী ভাবে অজানা তথ্যকে ধীরে ধীরে অর্থপূর্ণ করে তোলে, তারও এক অসাধারণ উদাহরণ।
১৮৫৬-তে যে হাড়কে শ্রমিকেরা গুরুত্ব না দিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত বদলে দিয়েছিল মানুষ নিজের অতীতকে কী ভাবে দেখে। কয়েকটি অচেনা হাড় থেকে শুরু হয়ে সেই অনুসন্ধান আজ পৌঁছে গিয়েছে রেডিয়োকার্বন ডেটিং, ডিএনএ বিশ্লেষণ এবং মানব-বিবর্তনের গভীর গবেষণায়।
