শিলিগুড়ি: পাহাড়ে কখন কোথায় ধস নামবে, নদীর পাড়ে কখন মাটি সরে গিয়ে বসে যাবে লাইন, আগাম আঁচ পাওয়াই এখন উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের (এনএফআর) অন্যতম বড় লক্ষ্য। সাম্প্রতিক একের পর এক ধস এবং তার জেরে রেল যোগাযোগ বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এ বার প্রযুক্তি ও মানব নজরদারি—দুই অস্ত্রেই ট্র্যাক সুরক্ষার পরিকল্পনা করেছে এনএফআর। মাটির নীচে ফাটল, ফাঁপা জায়গা কিংবা ইঁদুরের তৈরি গর্তও যাতে বিপদের কারণ হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য ব্যবহার করা হবে ‘গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডার’ (জিপিআর)। পাশাপাশি দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাড়ানো হচ্ছে ২৪ ঘণ্টার পায়ে হাঁটা নজরদারি।
উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়, জঙ্গল, নদী এবং ভূমিকম্পপ্রবণ বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার রেলপথের দায়িত্ব এনএফআরের। ফলে বর্ষা এলেই ট্র্যাকের নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি একাধিক জায়গায় পাহাড়ি ধসের কারণে রেল চলাচল ব্যাহত হয়েছে। কোথাও লাইন মাটির নীচে বসে গিয়েছে, কোথাও আবার ধসের মাটি এসে ঢেকেছে ট্র্যাক। তার জেরে কয়েক দিন ধরে ট্রেন বাতিল ও পরিষেবা বিঘ্নিত হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা।
এই পরিস্থিতিতেই নজরদারির পরিধি বাড়াচ্ছে রেল। এনএফআরের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক কে কে শর্মা জানিয়েছেন, যাত্রী নিরাপত্তা এবং ট্রেন পরিষেবার ক্ষেত্রে কোনও রকম আপস করা হবে না। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির পাশাপাশি ম্যানুয়াল পেট্রলিংও বাড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে নদী বা জলাশয়ের কাছাকাছি নিচু এলাকা, পাহাড়ি ঢাল, জঙ্গল এবং আগে ধস নামার নজির থাকা অংশগুলিকে রাখা হচ্ছে বাড়তি নজরদারির আওতায়।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে জিপিআর। সাধারণ ভাবে মাটির নীচে কী রয়েছে, তা জানতে খনন করে পরীক্ষা করতে হয়। কিন্তু জিপিআরের ক্ষেত্রে মাটি না কেটেই তার নীচের স্তরের ছবি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। যন্ত্রটি মাটির মধ্যে উচ্চ কম্পাঙ্কের তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ পাঠায়। মাটির বিভিন্ন স্তর, পাথর, ফাটল, ফাঁপা জায়গা বা অন্য কোনও অস্বাভাবিক কাঠামোয় ধাক্কা খেয়ে সেই তরঙ্গের প্রতিফলন ফিরে আসে। কম্পিউটার বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেই তথ্য থেকে মাটির নীচের গঠনের একটি ছবি তৈরি করা সম্ভব।
অর্থাৎ, বাইরে থেকে ট্র্যাক বা জমি আপাতদৃষ্টিতে ঠিকঠাক দেখালেও মাটির নীচে যদি ফাঁপা জায়গা তৈরি হয়, বড় ফাটল থাকে কিংবা ইঁদুরের গর্তের মতো কোনও শূন্যস্থান তৈরি হয়ে থাকে, তা আগেভাগেই চিহ্নিত করার সুযোগ মিলবে। সেই জায়গায় দ্রুত মাটি, পাথর বা কংক্রিট দিয়ে শক্তপোক্ত করে দেওয়া যাবে সংশ্লিষ্ট অংশ। লক্ষ্য একটাই—সমস্যা তৈরি হওয়ার পরে ট্রেন থামানোর বদলে সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই বিপদ ঠেকানো।
এই ভাবনার পিছনে রয়েছে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও। ফরাক্কা-ধুলিয়ান রুটে মাটির নীচে ইঁদুরের তৈরি গর্তের কারণে কোথাও কোথাও ট্র্যাক বসে যাওয়ার ঘটনা সামনে এসেছিল। পাহাড়ি এলাকায় আবার লাগাতার বৃষ্টির পরে মাটির ভিতরের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ধস নামার আশঙ্কা থাকে। ফলে শুধু চোখে দেখা পরিস্থিতির উপর নির্ভর করলে চলবে না—মাটির নীচের অবস্থাও নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছে রেল।
তবে প্রযুক্তি থাকলেও মানুষের নজরদারি কমছে না। বরং দুর্গম অংশে ট্র্যাককর্মী এবং গ্যাংম্যানদের আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। কোথাও মাটির রং বা গঠন বদলে যাওয়া, নতুন ফাটল দেখা দেওয়া, ঢাল থেকে মাটি বা পাথর খসে পড়া, জল জমার ধরন বদলে যাওয়া কিংবা ইঁদুরের গর্তের মতো কোনও চিহ্ন চোখে পড়লেই দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। ছোট একটি পরিবর্তনও যাতে বড় বিপদের পূর্বাভাস হয়ে ওঠে, সে জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণের উপরেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
রাতের নজরদারিও বাড়ানো হচ্ছে। সার্চলাইট নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশে পেট্রলিংয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের মাধ্যমে নজরদারি জোরদার করা হবে। বিশেষ করে প্রবল বৃষ্টি হলে নদীর ধার এবং পাহাড়ি ট্র্যাকগুলিতে পরিস্থিতির দ্রুত পর্যালোচনা করার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
রেলের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল পরিষেবা স্বাভাবিক রাখা এবং একই সঙ্গে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একটি ছোট ধসও পাহাড়ি রেলপথে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই ধস নামার পরে উদ্ধার ও মেরামতের বদলে ধসের সম্ভাবনা আগে থেকে চিহ্নিত করে প্রতিরোধ করাই এনএফআরের নতুন কৌশল। রাডারের চোখে মাটির নীচের বিপদ এবং কর্মীদের চোখে মাটির উপরকার পরিবর্তন—দুই নজরদারি মিলিয়েই ট্র্যাককে আরও নিরাপদ করার পরিকল্পনা রেলের।




