বিশেষ প্রতিবেদন: ঠান্ডা জল খেলেই দাঁতে শিরশির করে উঠছে। শক্ত কিছু চিবোতে গেলেই আচমকা তীব্র ব্যথা। কখনও আবার কোনও কারণ ছাড়াই দাঁতের ভিতর থেকে যেন টনটন করে উঠছে। অথচ ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করিয়েছেন—ক্যাভিটি নেই! তা হলে ব্যথাটা কোথা থেকে? শুধু দাঁতে গর্ত হলেই যে দাঁতে ব্যথা হয়, এমন নয়। দাঁত, মাড়ি, স্নায়ু থেকে শুরু করে নাকের সাইনাস—শরীরের একাধিক জায়গার সমস্যার ‘বার্তা’ হিসাবেও দাঁতের ব্যথা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকের মতে, এমন রহস্যময় দাঁতের ব্যথার পিছনে থাকতে পারে অন্তত আটটি কারণ।
১.ক্যাভিটি নয়, দাঁতের ‘সেনসিটিভিটি’
সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলির একটি হল দাঁতের অতিসংবেদনশীলতা। দাঁতের বাইরের শক্ত আবরণ এনামেল ক্ষয়ে গেলে অথবা মাড়ি সরে গিয়ে দাঁতের শিকড়ের অংশ উন্মুক্ত হলে ভিতরের ডেন্টিন বাইরের উদ্দীপনার প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। তখন ঠান্ডা জল, গরম চা, মিষ্টি কিংবা টক খাবার মুখে দিলেই আচমকা ঝাঁকুনি দিয়ে ব্যথা হতে পারে। সাধারণত উদ্দীপনা সরিয়ে নিলে ব্যথাও কমে যায়।
২.দাঁত ঠিক, সমস্যা মাড়িতে
দাঁত দেখতে একেবারে স্বাভাবিক হলেও মাড়ির সমস্যা থেকে ব্যথা হতে পারে। মাড়ি সরে গেলে দাঁতের এমন অংশ বেরিয়ে আসে, যা সাধারণত মাড়ির আড়ালে ঢাকা থাকে। আবার মাড়ির রোগে ফুলে যাওয়া, ব্যথা, ব্রাশ করার সময় রক্ত পড়া বা মাড়ির অবস্থান বদলে যাওয়াও দেখা দিতে পারে। তাই ‘দাঁতে গর্ত নেই’ বলে মাড়ির সমস্যাকে হালকা ভাবে নেওয়া ঠিক নয়।
৩.চোখে দেখা যায় না, অথচ দাঁতে চিড়
দাঁতের সূক্ষ্ম ফাটল অনেক সময় সাধারণ ভাবে দেখলে ধরা পড়ে না। কিন্তু সেই ছোট্ট চিড়ই তৈরি করতে পারে প্রবল ব্যথা। বিশেষ করে শক্ত কিছু কামড়ানোর সময় বা কামড়ের চাপ ছাড়ার মুহূর্তে যদি তীব্র ব্যথা হয়, তা হলে দাঁতে কোনও গঠনগত সমস্যা বা সূক্ষ্ম ফাটল রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা দরকার।
৪.রাতে দাঁত ঘষছেন, টেরই পাচ্ছেন না!
ঘুমের মধ্যে দাঁত চেপে ধরা বা ঘষার অভ্যাস—যাকে ব্রুক্সিজম বলা হয়—অনেকেই নিজের ক্ষেত্রে বুঝতে পারেন না। অথচ রাতভর দাঁতে অতিরিক্ত চাপ পড়তে থাকলে সকালে দাঁত ও চোয়ালে ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে। দীর্ঘ দিন চললে দাঁতের ক্ষয় ও ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়ে।
৫.আসলে দাঁত নয়, সাইনাসের সমস্যা
শুনতে অবাক লাগলেও সাইনাসের প্রদাহ থেকেও দাঁতে ব্যথা অনুভূত হতে পারে। বিশেষ করে উপরের পিছনের দাঁতগুলির শিকড় ম্যাক্সিলারি সাইনাসের খুব কাছাকাছি। ফলে সাইনাসে প্রদাহ বা চাপ তৈরি হলে সেই ব্যথা একাধিক উপরের দাঁতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে নাক বন্ধ, সর্দি বা মুখের আশপাশে চাপের অনুভূতি থাকলে কারণটি দাঁতের বদলে সাইনাসও হতে পারে।
৬.বুদ্ধির দাঁত উঠছে
বয়স্কদের ক্ষেত্রেও দাঁতের ব্যথার পিছনে থাকতে পারে উইজ়ডম টুথ বা আক্কেল দাঁত। জায়গার অভাবে দাঁত ঠিক ভাবে বেরোতে না পারলে বা তার চারপাশের মাড়িতে প্রদাহ হলে ব্যথা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ক্যাভিটি খুঁজে লাভ নেই—সমস্যার উৎস দাঁতের বেরোনোর পথেই।
৭.দাঁতের গভীরে স্নায়ুর প্রদাহ
দাঁতের একেবারে ভিতরে রয়েছে পাল্প—যেখানে থাকে স্নায়ু ও রক্তনালি। আঘাত, পুরনো বা বড় ধরনের ডেন্টাল চিকিৎসা, কিংবা দাঁতে ফাটলের পর এই অংশে প্রদাহ বা সংক্রমণ হতে পারে। বাইরে থেকে কোনও ক্যাভিটি চোখে না পড়লেও ভিতরে তীব্র ব্যথা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রমশ বাড়তে থাকা ব্যথার ক্ষেত্রে এই কারণটি বিশেষ ভাবে পরীক্ষা করা জরুরি।
৮.যে দাঁতে ব্যথা, সমস্যা হয়তো সেই দাঁতে নেই
সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর কারণগুলির একটি হল ‘রেফার্ড পেইন’। অর্থাৎ যে দাঁতটিতে ব্যথা অনুভূত হচ্ছে, সমস্যাটি আসলে পাশের কোনও দাঁতেও থাকতে পারে। ফলে আয়নায় দেখে বা আঙুল দিয়ে চাপ দিয়ে নিজে নিজে কোন দাঁতে সমস্যা তা নির্ণয় করা সব সময় সম্ভব নয়। চিকিৎসকের পরীক্ষা তাই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সব দাঁতের ব্যথা সমান নয়। ঠান্ডা বা গরম লাগার পর অল্প সময়ের জন্য হালকা শিরশিরানি আর ক্রমশ বাড়তে থাকা, নিজে থেকেই শুরু হওয়া তীব্র ব্যথা—দুইয়ের অর্থ এক নয়। বিশেষ করে চিবোতে গেলে ব্যথা, মুখ বা মাড়ি ফুলে যাওয়া, জ্বর, কিংবা ঠান্ডা-গরমের সংস্পর্শ সরিয়ে নেওয়ার পরেও ব্যথা থেকে গেলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এ ধরনের উপসর্গে দ্রুত ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়া প্রয়োজন।
অর্থাৎ, ক্যাভিটি নেই মানেই দাঁত সম্পূর্ণ সুস্থ—এমন ধারণা ভুল। দাঁতের ব্যথা অনেক সময় শরীরের অন্য কোনও সমস্যারও সংকেত হতে পারে। তাই বার বার ব্যথানাশক খেয়ে উপসর্গ চাপা না দিয়ে ব্যথার ধরন, কখন হচ্ছে এবং কতক্ষণ থাকছে—সেই তথ্য নিয়ে দাঁতের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।