বিশেষ প্রতিবেদন: রাত বাড়ছে। ঘুমোতে যাওয়ার কথা। কিন্তু হাতে ফোন। একটি খবর, তার পর আর একটি ভিডিয়ো, তার পর সমাজমাধ্যমের পোস্ট—এ ভাবেই কখন যে আধ ঘণ্টা, এক ঘণ্টা পেরিয়ে যায়, টেরই পাওয়া যায় না। যুদ্ধের খবর থেকে মজার ভিডিয়ো, রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে ব্যক্তিগত পোস্ট—একটার পর একটা তথ্য চোখের সামনে আসতেই থাকে। এই অভ্যাসকেই বলা হচ্ছে ‘ডুমস্ক্রলিং’। আর নিয়মিত ভাবে ঘুমের আগে এই অভ্যাস চলতে থাকলে তার প্রভাব পড়তে পারে ঘুম এবং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিশ্রামে।
মুম্বইয়ের এসএল রাহেজা হাসপাতালের কনসালট্যান্ট নিউরোলজিস্ট ও এপিলেপ্টোলজিস্ট ডা. শ্রীলক্ষ্মী এন-এর মতে, অতিরিক্ত ডুমস্ক্রলিং মস্তিষ্কের নিজেকে ‘রিচার্জ’ করার প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় ফোনের পর্দায় চোখ রাখলে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কেন এমন হয়? বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যায়, রাতে পর্দার আলো মেলাটোনিন উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। মেলাটোনিন শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। ফলে ঘুম দেরিতে আসতে পারে বা ঘুমের মান খারাপ হতে পারে। আর পর্যাপ্ত ঘুম না হলে তার প্রভাব পরের দিনের মস্তিষ্কেও পড়ে—স্মৃতিশক্তি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, মেজাজ এবং সামগ্রিক চিন্তাশক্তিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এখানেই শেষ নয়। ডুমস্ক্রলিং তৈরি করতে পারে এক ধরনের চক্র। উদ্বেগ বা অস্বস্তিকর খবর মস্তিষ্ককে আরও সতর্ক করে রাখে। তার সঙ্গে পর্দার আলো এবং দীর্ঘ সময় জেগে থাকা ঘুমকে আরও পিছিয়ে দেয়। পরের দিন ঘুম ঘুম ভাব, মানসিক ক্লান্তি, ভুলে যাওয়া বা খিটখিটে মেজাজ—সবই দেখা দিতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ফোন হাতে নেওয়া মাত্রই বিপদ। বিশেষজ্ঞের বক্তব্য, মাঝেমধ্যে কিছুক্ষণ স্ক্রল করা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। সমস্যা তৈরি হতে পারে যখন সেটি প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয় এবং মনোযোগ ও মানসিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
তা হলে উপায়? প্রথমেই খবর বা সমাজমাধ্যম দেখার জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করা যেতে পারে। সারাক্ষণ নতুন আপডেট দেখার বদলে দিনে কয়েকটি নির্দিষ্ট সময়ে খবর দেখা অনেক বেশি কার্যকর। ঘুমোতে যাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন, ট্যাব বা অন্য ডিজিটাল ডিভাইস সরিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ। অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করাও জরুরি—কারণ একটি ছোট ‘অ্যালার্ট’-ই ফের শুরু করে দিতে পারে ঘণ্টাখানেকের স্ক্রলিং।
আর যদি দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত উদ্বেগ, মাথাব্যথা, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বা দৈনন্দিন কাজে মনোযোগের সমস্যা দেখা দিতে থাকে, তখন শুধু ফোন দূরে রাখাই যথেষ্ট নয়—চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
দিনভর তথ্যের ভিড়ে মস্তিষ্ককে যদি এক মুহূর্তও থামতে না দেওয়া হয়, রাতে বিছানায় গিয়েও তার ‘শিফট’ শেষ হয় না। তাই ঘুমের আগে শেষ স্ক্রলটি কখন থামবে, সেটাই হয়তো পরের দিনের সতেজতা ঠিক করার ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।