নয়াদিল্লি, নিউজ ডেস্ক: ১৩ বছর আগের সেই মঞ্চ। তখন তিনি গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী। জাতীয় রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদীর নাম নিয়ে জল্পনা শুরু হলেও প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে বিজেপি তাঁকে ঘোষণা করেনি। আর শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, সেই একই মঞ্চে ফিরলেন মোদী—এ বার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে, টানা তৃতীয় মেয়াদে। উপলক্ষ, দিল্লির শ্রীরাম কলেজ অফ কমার্স বা SRCC-র শতবর্ষ উদ্যাপন। সময়ের ব্যবধান ১৩ বছর। কিন্তু রাজনৈতিক অর্থে যেন একটি সম্পূর্ণ বৃত্ত।
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি। SRCC-তে মোদীর বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘Emerging Business Models in the Global Scenario’। নাম শুনলে অর্থনীতি বা বাণিজ্য নিয়ে বক্তৃতা মনে হতে পারে। কিন্তু সে দিন কলেজের মঞ্চে মোদী আসলে তুলে ধরেছিলেন তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক। তরুণ ভারত, প্রশাসন, উন্নয়ন এবং সরকারের ভূমিকা—সব মিলিয়ে বক্তৃতাটি পরবর্তী রাজনৈতিক যাত্রার অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
সেই বক্তৃতার সবচেয়ে মনে রাখার মতো দৃশ্য ছিল একটি গ্লাস জল। অর্ধেক ভর্তি গ্লাসকে কেউ দেখেন ‘অর্ধেক ভর্তি’ বলে, কেউ আবার ‘অর্ধেক খালি’। মোদী বলেছিলেন, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা—গ্লাসে অর্ধেক জল, বাকি অর্ধেক হাওয়া। অর্থাৎ সমস্যা বা ঘাটতির জায়গায় আটকে না থেকে সম্ভাবনার দিকটিও দেখতে হবে। সেই ‘তৃতীয় দৃষ্টিভঙ্গি’র গল্পই পরে তাঁর SRCC বক্তৃতার অন্যতম পরিচিত প্রতীক হয়ে যায়।
সে দিন তরুণদের নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছিলেন মোদী। তাঁর বক্তব্য ছিল, দেশের যুবসমাজকে শুধু ‘নতুন ভোটার’ হিসাবে দেখলে চলবে না, তাঁরা দেশের ‘নতুন শক্তি’। ভারতের বিপুল তরুণ জনসংখ্যাকে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন তিনি। পরবর্তী বছরগুলিতে রাজনৈতিক প্রচারে ‘ইয়ুথ পাওয়ার’ বা তরুণ ভারতের সম্ভাবনা তাঁর বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
২০১৩-র সেই মঞ্চেই উঠে এসেছিল ‘মিনিমাম গভর্নমেন্ট, ম্যাক্সিমাম গভর্ন্যান্স’-এর ভাবনা। সরকারের কাজ কী হওয়া উচিত, প্রশাসনের ভূমিকা কতটা এবং ব্যবসা পরিচালনায় সরকারের সরাসরি উপস্থিতির প্রয়োজন কতটা—এসব প্রশ্নে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন তৎকালীন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী। পরে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে এই ধারণাই মোদীর রাজনৈতিক বয়ানের অন্যতম পরিচিত অংশ হয়ে ওঠে।
তার পরের কাহিনি ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাস। ২০১৪-তে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির নেতৃত্বে কেন্দ্রে সরকার গড়ে প্রধানমন্ত্রী হন মোদী। ২০১৯-এ দ্বিতীয় বার এবং ২০২৪-এ তৃতীয় বার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন। অর্থাৎ ২০১৩-তে যে মানুষটি SRCC-র মঞ্চে দাঁড়িয়ে জাতীয় স্তরের সম্ভাবনার কথা বলছিলেন, ১৩ বছর পরে তিনিই সেই কলেজে ফিরলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে।
এ বারের SRCC-ও অবশ্য অন্য এক সন্ধিক্ষণে। ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান ২০২৬-এ একশো বছর পূর্ণ করেছে। শতবর্ষের অনুষ্ঠানটি শিক্ষক দিবসের সঙ্গেও মিলে গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে মোদী কলেজের পড়ুয়া, শিক্ষক, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী এবং প্রাক্তন শিক্ষকদের উপস্থিতিতে বক্তব্য রাখেন।
আর এই প্রত্যাবর্তনের শুরুটাও ছিল খানিক আলাদা। অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে দিল্লি মেট্রোয় সফর করেন মোদী। হাতে ছিল মেট্রো কার্ড, পথে পড়ুয়া ও সহযাত্রীদের সঙ্গে কথাও বলেন। তার পর সেই SRCC—যেখানে ১৩ বছর আগে একটি গ্লাস জল হাতে দাঁড়িয়ে সম্ভাবনার অন্য পাঠ দিয়েছিলেন তিনি।
একটি গ্লাস জল, ১৩ বছরের ব্যবধান, আর এক দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা, SRCC-র সেই পুরনো মঞ্চে মোদীর প্রত্যাবর্তনে তাই শুধুই স্মৃতিচারণ নয়, তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের একটি প্রতীকী অধ্যায়ও যেন নতুন করে সামনে এল।