ভোপাল: নদীটা এক সময় ছিল নদীই। জল ছিল। ছিল মাছ, ছিল জলজ প্রাণ। আশপাশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে ছিল তার সম্পর্ক। তার পর ধীরে ধীরে নদীর বুকে জমতে শুরু করল প্লাস্টিক। এল বোতল, পলিথিন, আবর্জনা, শ্যাওলা। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পর ফেলে দেওয়া সামগ্রীও জমল জলে। এক সময় এমন দশা হল, দূর থেকে অজনার নদীকে নদী নয়, নোংরা নালাই মনে হত।
মানুষ দেখেছেন। পাশ কাটিয়ে গিয়েছেন। অভিযোগও হয়েছে। কিন্তু নদী পরিষ্কার হয়নি। শেষ পর্যন্ত এক দিন নদীতে নামলেন এক তরুণ। হাতে বড় কোনও যন্ত্র নেই। সঙ্গে কোনও সরকারি বাহিনী নেই। নেই কোনও বড় সংস্থার অর্থসাহায্য। আছে শুধু জেদ, ‘নদীটা এ ভাবে থাকতে পারে না।’
সূত্র: https://x.com/RT_India_news/status/2095382272073736492?s=20
মধ্যপ্রদেশের রাজগড় জেলার বিয়াওরার ২০ বছরের যুবক সুরেন্দ্র সিংহ চৌধুরী। সমাজমাধ্যমে পরিচিত ‘বিট্টু তবাহী’ নামে। অজনার নদীকে আবর্জনার স্তূপ থেকে ফের স্বাভাবিক চেহারায় ফিরিয়ে আনার যে লড়াই তিনি শুরু করেছেন, তা এখন ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দেশে।
গল্পের শুরু ২৬ জানুয়ারি, প্রজাতন্ত্র দিবসে। অজনার নদীর করুণ অবস্থা দেখে আর অপেক্ষা করতে পারেননি বিট্টু। কয়েক জন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে নদী পরিষ্কারের কাজে নেমেছিলেন। শুরুটা ছিল দল বেঁধে। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, একে একে বন্ধুরা সরে গিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত কাজটা এসে পড়েছে বিট্টুর একার কাঁধে। তাতেও থামেননি তিনি।
প্রতিদিন নদীতে নেমেছেন। জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে হাতে তুলে নিয়েছেন প্লাস্টিক, বোতল, শ্যাওলা এবং জমে থাকা নানা ধরনের আবর্জনা। নদীর যে অংশগুলিতে জলপ্রবাহ আবর্জনায় আটকে যাচ্ছিল, সেগুলিও পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন। বড় যন্ত্রের বদলে শুরুতে ছিল সামান্য কিছু সরঞ্জাম এবং নিজের শ্রম।
শুধু আবর্জনা তুলে নদীর পাড়ে ফেলে রাখেননি বিট্টু। নদীতে ফেলে দেওয়া ধর্মীয় সামগ্রীও আলাদা করে সংগ্রহ করেছেন। সেগুলিকে কাজে লাগিয়ে কম্পোস্ট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন, যাতে সেই বর্জ্য ফের কোনও ভাবে নদীতে না ফিরে আসে। এই কাজে নিজের পকেট থেকেও টাকা খরচ হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায় ৩০ হাজার টাকা নিজের অর্থ খরচ করার কথা উঠে এসেছে। পরে প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয় পুরসভা থেকেও যন্ত্রপাতি দিয়ে সহায়তা করা হয়েছে। কাজটা কিন্তু মোটেই সহজ ছিল না।
দূষিত নদীর জলে দিনের পর দিন নামতে গিয়ে শারীরিক সমস্যাও হয়েছে। হাত-পায়ে জ্বালা, ত্বকের সমস্যা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু নদীর অবস্থা বদলাতে শুরু করেছিল। আর সেই বদলই বিট্টুর সবচেয়ে বড় শক্তি।
আগে যেখানে জলের উপর আবর্জনার আস্তরণ দেখা যেত, ধীরে ধীরে সেখানে জল দেখা যেতে শুরু করল। যে জায়গাগুলি দেখতে নোংরা নালার মতো লাগত, সেখানেই ফিরল নদীর চেহারা। বিট্টু তাঁর সমাজমাধ্যমের পাতায় কাজের ভিডিয়ো এবং ‘আগে-পরে’র ছবি প্রকাশ করতে থাকেন। সেই ছবিই পরে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক ভাবে।
তবে প্রশংসা শুরু থেকেই জোটেনি। বরং কটাক্ষই ছিল আগে। কেউ বলেছিলেন, বিট্টু নাকি শুধু ভিডিয়ো বানাচ্ছেন। কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন, সমাজমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার জন্যই কি এই সব? এমনকি তাঁর প্রকাশ করা কিছু ছবি নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বিট্টুর জবাব ছিল কাজ দিয়েই।
‘ভিডিয়ো বানিয়েছি, ঠিক। কিন্তু কাজও তো করেছি।’ আর সেই কাজের ছবিই ধীরে ধীরে তাঁর হয়ে কথা বলতে শুরু করে। সমাজমাধ্যমে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। নদীর পরিষ্কারের ছবি ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে। যে যুবককে এক সময় স্থানীয় স্তরে কটাক্ষ শুনতে হয়েছিল, তাঁর কাজ পৌঁছে যায় শিল্পপতি আনন্দ মহিন্দ্রার কাছেও। তিনি বিট্টুর উদ্যোগের প্রশংসা করে তাঁকে নিজের ‘Monday Motivation’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল—সমাজমাধ্যম যদি ‘লাইক’ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকেও ভাল কাজের শক্তিতে বদলে দিতে পারে, তা হলে সেই জনপ্রিয়তারও মূল্য আছে।
এখানেই বিট্টুর গল্পটা শুধু এক জন তরুণের গল্প থাকে না। এটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় আমাদের সামনে। একটি নদী নোংরা হতে কত জনের সময় লাগে? হয়তো কয়েক দিন, কয়েক মাস, কয়েক বছর। কেউ প্লাস্টিক ফেলেন, কেউ বোতল, কেউ পুজোর সামগ্রী। কেউ দেখে চুপ থাকেন। আর সেই ‘চুপ থাকা’ই ধীরে ধীরে নদীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
অজনারও সেই পথেই এগোচ্ছিল। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, এক সময় নদীর জল ব্যবহারযোগ্য ছিল, নদীতে জলজ প্রাণও ছিল। ক্রমাগত দূষণ এবং আবর্জনার চাপে সেই স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হতে থাকে। নদীকে বাঁচানোর জন্য স্থানীয় স্তরে উদ্যোগের কথাও উঠেছে। কিন্তু বিট্টুর উদ্যোগ সেই পুরনো প্রশ্নটাকেই নতুন করে সামনে এনেছে—একটি নদী বাঁচানোর দায়িত্ব কি শুধু প্রশাসনের?
নাকি নদীর পাশে বসবাসকারী মানুষেরও? বিট্টু অবশ্য নিজেকে কোনও বড় পরিবেশকর্মী বলে দাবি করছেন না। তিনি একজন তরুণ, পড়াশোনা করছেন, নিজের মতো করে কাজ করছেন। তাঁর কাছে বিষয়টি অনেক সহজ—যে নদী তাঁর চোখের সামনে নষ্ট হচ্ছে, সেটিকে বাঁচানোর জন্য কেউ এগিয়ে না এলে তিনি নিজেই এগোবেন।
আর সেই কারণেই তাঁর গল্পে চমক শুধু ‘২০ বছরের ছেলে নদী পরিষ্কার করছেন’, এখানে নয়। চমকটা আরও গভীরে। যে কাজের জন্য একটা গোটা ব্যবস্থা দরকার বলে আমরা ধরে নিই, সেটাই এক জন তরুণ শুরু করে দিয়েছেন নিজের দুই হাত দিয়ে।
সমাজমাধ্যমে তাঁর ভিডিয়ো এখন লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে। প্রশংসা আসছে দূরদূরান্ত থেকে। কিন্তু বিট্টুর সামনে আসল পরীক্ষা অন্য জায়গায়—নদী পরিষ্কার করার পর সেটিকে আবার যাতে আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হতে না দেওয়া হয়।
কারণ নদী পরিষ্কার করা যতটা কঠিন, পরিষ্কার রাখা তার চেয়েও কঠিন। এক জন বিট্টু অজনারের জলে নেমেছেন। কিন্তু নদীকে সত্যিই বাঁচাতে হলে তাঁকে একা থাকতে দিলে চলবে না। হয়তো এটাই তাঁর গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। নদীকে নোংরা করার সময় আমরা প্রত্যেকে দায়ী। নদীকে বাঁচানোর সময়ও তাই প্রত্যেকের হাত বাড়ানো দরকার।
বিট্টুর হাতে যে আবর্জনা উঠছে, তার মধ্যে শুধু প্লাস্টিক নেই। আছে আমাদের দীর্ঘ দিনের উদাসীনতাও। আর সেই উদাসীনতার বিরুদ্ধে ২০ বছরের এক তরুণের লড়াই এখন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে গোটা দেশের দিকে, ‘নদীটা কি সত্যিই শুধু আমার? নাকি আমাদের সবার?’