কলকাতা: বিয়েবাড়ির ছাদ থেকে হোক, পর্যটনকেন্দ্রের আকাশে হোক কিংবা নিছক শখে—ড্রোন এখন আর কেবল পেশাদারদের যন্ত্র নয়। হাতের নাগালে এসেছে ছোট ছোট ক্যামেরা-ড্রোন। মোবাইলের সঙ্গে জুড়ে মুহূর্তে আকাশের ছবি, ভিডিয়ো। কিন্তু যে যন্ত্রটি দিয়ে কয়েক মিনিটে আকাশের নজরকাড়া ছবি তোলা যায়, সেটিই ভুল জায়গায় উড়লে ডেকে আনতে পারে আইনি বিপদ। কারণ ভারতের আকাশসীমা ‘যার খুশি, যেখানে খুশি’ ড্রোন ওড়ানোর জন্য খোলা নয়।
ড্রোন উড়ানোর আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি জানতে হবে, তা হল এলাকাটি কোন জোনে পড়ছে। সরকারি নিয়মে ড্রোনের উড়ান নিয়ন্ত্রণে আকাশসীমাকে মূলত তিন ভাগে দেখা হয়—গ্রিন জোন, ইয়েলো জোন এবং রেড জোন। কোথাও তুলনামূলক ভাবে সহজে ড্রোন ওড়ানো যায়, কোথাও প্রয়োজন হয় অনুমতির, আবার কোথাও বিশেষ অনুমতি ছাড়া ড্রোন ওড়ানোই নিষিদ্ধ।
গ্রিন জোন শুনে অনেকেই ধরে নেন, সেখানে কোনও নিয়ম নেই। ধারণাটি ভুল। এই এলাকায় নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ড্রোন ওড়ানো যায়। তবে উড়ান শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার বর্তমান airspace status পরীক্ষা করা জরুরি। কারণ কোনও এলাকায় সাময়িক ভাবে উড়ান নিষেধাজ্ঞা জারি হতে পারে। তাই ড্রোন হাতে নিয়ে সরাসরি আকাশে তুলে দেওয়ার আগে সরকারি Digital Sky প্ল্যাটফর্মে এলাকার পরিস্থিতি দেখে নেওয়াই নিরাপদ।
আর ইয়েলো জোনে নিয়ম আরও কড়া। এই এলাকায় ড্রোন ওড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হতে পারে। বিমানবন্দর-সংলগ্ন আকাশসীমা নিয়ে বিশেষ সতর্কতা রয়েছে। ফলে বাড়ির ছাদ থেকে ড্রোনটি কত দূর পর্যন্ত যাবে, সেটি শুধু চালকের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না। এলাকার airspace classification এবং প্রযোজ্য অনুমতির নিয়ম আগে জানতে হবে।
সবচেয়ে কড়া রেড জোন। এই এলাকায় ড্রোন উড়ানো সাধারণ ভাবে নিষিদ্ধ। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া সেখানে ড্রোন নিয়ে আকাশে ওঠার সুযোগ নেই। অর্থাৎ কোনও জায়গা রেড জোন কি না, তা না জেনে ড্রোন ওড়ানো নিছক অসাবধানতা নয়—আইন ভাঙার কারণও হয়ে উঠতে পারে।
এখানেই শেষ নয়। ড্রোনের ধরন অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন, ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (UIN), চালকের প্রশিক্ষণ বা শংসাপত্রের মতো একাধিক বিধি প্রযোজ্য হতে পারে। কোন ড্রোনে কোন নিয়ম লাগবে, সেটিও উড়ানের আগে যাচাই করা দরকার। বিশেষ করে বাণিজ্যিক কাজে ড্রোন ব্যবহার করলে নিয়ম আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিমানবন্দরের আশপাশে ড্রোন ওড়ানোর বিষয়টি সবচেয়ে সংবেদনশীল। আকাশে কয়েকশো ফুট উড়ে যাওয়া একটি ছোট ড্রোনও বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই বিমানবন্দর, প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত এলাকা বা অন্য সংবেদনশীল স্থানের কাছে ড্রোন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা বিপজ্জনক।
সমস্যা হল, অনেকেরই ধারণা—ছোট ড্রোন, তাই আইনও ছোট। বাস্তবে তা নয়। ড্রোনের আকার ছোট হলেও তার উড়ান নিয়ন্ত্রিত। ভুল জায়গায়, ভুল সময়ে কিংবা প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া ড্রোন ওড়ালে সংশ্লিষ্ট আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তাই শুধু ড্রোন কেনার সময় তার ক্যামেরা কত মেগাপিক্সেল বা কত দূর পর্যন্ত উড়তে পারে, তা দেখলেই হবে না; কোথায় সেটি আইনত ওড়ানো যাবে, সেটিও জানা জরুরি।
বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে ছবি বা ভিডিয়ো পোস্ট করার নেশায় অনেকেই নিয়মের কথা ভুলে যান। পর্যটনকেন্দ্র, সরকারি ভবন, বিমানবন্দর কিংবা নিরাপত্তার দিক থেকে সংবেদনশীল এলাকায় ড্রোন উড়ানোর আগে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
অতএব, ড্রোনের রিমোট হাতে নেওয়ার আগে তিনটি প্রশ্ন—এলাকাটি কোন জোনে? অনুমতি লাগবে কি? ড্রোনটি নিয়ম মেনে রেজিস্টার করা আছে কি? উত্তর না জেনে আকাশে ড্রোন তোলা ঠিক নয়। কারণ আকাশে উড়তে কয়েক সেকেন্ড লাগে, কিন্তু ভুল উড়ানের আইনি মাশুল গুনতে হতে পারে অনেক দিন।