কাঠমান্ডু: আকাশ থেকে দেখলে প্রথমে বোঝাই যায় না, এখানে এক সময় নদী ছিল। ছিল রাস্তা, সেতু, বাড়িঘর, দোকান, হোটেল। ছিল মানুষের ব্যস্ত চলাচল। এখন সেখানেই যত দূর চোখ যায়, শুধু ধূসর কাদার চাদর, পাথরের স্তূপ আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ। কোথাও নদীর গতিপথ চওড়া হয়ে গিলে নিয়েছে গোটা উপত্যকাকে, কোথাও আবার জনপদের জায়গায় তৈরি হয়েছে কাদামাটির বিশাল প্রান্তর।
হেলিকপ্টার থেকে তোলা সাম্প্রতিক ছবিতে নেপালের ত্রিশূলী নদী উপত্যকার সেই ভয়াবহ চেহারাই ধরা পড়েছে। যে পাহাড়ি গিরিখাতগুলি এত দিন ছিল সরু ও গভীর, বিপর্যয়ের পরে সেগুলির অনেকটাই যেন সমতল হয়ে গিয়েছে। নদীর জল সরে যাওয়ার পর সামনে এসেছে ধ্বংসের আসল ছবি—কোথাও বাড়ির কঙ্কাল, কোথাও রাস্তার চিহ্নমাত্র নেই, কোথাও সেতুর অস্তিত্বও মুছে গিয়েছে।
২৬ অগস্টের সেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়েছে ত্রিশূলী নদীর উপত্যকা এবং সংলগ্ন এলাকায়। পাহাড়ি এলাকায় হঠাৎ নেমে আসা বিপুল জল, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ মুহূর্তের মধ্যে নীচের দিকে ধেয়ে যায়। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ছাপিয়ে সেই স্রোত আছড়ে পড়ে জনবসতি ও পরিকাঠামোর উপর। একের পর এক গ্রাম, রাস্তা, সেতু এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
সবচেয়ে ভয়াবহ ছবিগুলির একটি নেপালের দেবীঘাট এলাকার। আকাশ থেকে সেখানে দেখা যাচ্ছে, বিস্তীর্ণ এলাকায় বাড়িঘরের শুধু কঙ্কাল দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাকিটা ঢেকে দিয়েছে কাদা ও পাথর। কোথাও ঘরের ছাদ নেই, কোথাও দেওয়াল অর্ধেক ভেঙে পড়েছে। যে জায়গায় এক সময় মানুষের সংসার ছিল, সেখানে এখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে খুঁজে বেড়াতে হচ্ছে পরিচিত কোনও চিহ্ন।
ত্রিশূলী উপত্যকার আর এক ভয়াবহ চিত্র স্যাব্রুবেশি-তে। এক সময়ের জনবহুল এলাকা এখন যেন ধূসর মরুভূমি। বাড়িঘরের বদলে পড়ে রয়েছে কাদা, পাথর আর ভাঙা পরিকাঠামো। নদীর জল যে কী বিপুল শক্তিতে সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, উপর থেকে তাকালেই তার আন্দাজ পাওয়া যায়।
বিপর্যয়ের অভিঘাত শুধু গ্রাম বা রাস্তার মধ্যেই আটকে নেই। ত্রিশূলী নদীঘেঁষা একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ভয়াবহ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু কর্মী নিখোঁজ। কয়েকটি প্রকল্পের সুড়ঙ্গ ধসে কাদা-পাথরে আটকে গিয়েছে। ফলে উদ্ধারকারীদের লড়াই এখন শুধু ধ্বংসস্তূপ সরানোর নয়—অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভিতরে এখনও কেউ বেঁচে আছেন কি না, সেই উত্তর খোঁজারও।
সেই লড়াইয়ের মধ্যেই এসেছে আশার খবর। ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে নয় দিন পর জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে দুই কর্মীকে—সঞ্জয় সাহ ও কবীর মহারজনকে। প্রায় ১৭০ মিটার ভিতরে আটকে ছিলেন তাঁরা। তাঁদের উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে আশা জাগিয়েছে যে, ধ্বংসস্তূপের নীচে আরও কেউ জীবিত থাকতে পারেন।
কিন্তু সেই আশার পাশাপাশি ভয়াবহ বাস্তবও সামনে। নেপালে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ১,২০০ ছাড়িয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ বলে বিভিন্ন রিপোর্টে জানানো হয়েছে। বহু প্রত্যন্ত এলাকায় রাস্তা ও সেতু ধ্বংস হওয়ায় স্থলপথে পৌঁছনো কঠিন। কোথাও পৌঁছতে হচ্ছে হেলিকপ্টারে। ফলে উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই নতুন করে সামনে আসছে বিপর্যয়ের বিস্তার।
আকাশের ছবি তাই শুধু ধ্বংসের ছবি নয়। তা দেখাচ্ছে, একটি নদী কী ভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি গোটা ভূখণ্ডের চেহারা বদলে দিতে পারে। যে উপত্যকায় পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যেত নদী, সেই উপত্যকাই এখন যেন নদীর রেখে যাওয়া ক্ষত। বাড়ি নেই, সেতু নেই, রাস্তা নেই—আছে শুধু কাদার নীচে চাপা পড়ে থাকা অগণিত জীবনের স্মৃতি।
নদী তার পথ খুঁজে নিয়েছে। কিন্তু সেই পথে পড়ে থাকা মানুষের জীবন আর আগের জায়গায় ফিরবে কি না—এই প্রশ্নই এখন নেপালের সামনে সবচেয়ে বড়।