কলকাতা, নিউজ ডেস্ক: শিক্ষক দিবসের মঞ্চ। সামনে শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, পড়ুয়া এবং অভিভাবকেরা। সেই মঞ্চ থেকেই হঠাৎ অন্য এক ‘শত্রু’র কথা তুললেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কোনও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, হাতে থাকা মোবাইল ফোন! তাঁর আশঙ্কা, পড়াশোনার সহায়ক হওয়ার বদলে মোবাইলই এখন বহু পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ নষ্ট করার অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। বাবা-মায়ের চোখ এড়িয়ে রাত দেড়টা-দু’টো পর্যন্ত মোবাইলে ডুবে থাকছে পড়ুয়ারা। ঘুমের সময় কমছে, পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে, ধাক্কা খাচ্ছে মানসিক বিকাশও। এই প্রবণতা রুখতে প্রয়োজন হলে ‘কঠিন সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার বার্তাই দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
শনিবার নিউ টাউনে ‘বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান ২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানেই পড়ুয়াদের মোবাইল ব্যবহারের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রতি মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা আগামী প্রজন্মের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। শুধু স্কুলে পড়াশোনা করলেই হবে না, বাড়ির পরিবেশ এবং দৈনন্দিন অভ্যাসও পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ গড়ে দেয়, সেই জায়গাতেই মোবাইল আসক্তি বড় সমস্যা তৈরি করছে বলে তাঁর বক্তব্য।
গুজরাতের উদাহরণও টানেন তিনি। তাঁর দাবি, সেখানে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়াদের হাতে মোবাইল দেওয়া হয় না অথবা ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তার সঙ্গে এ রাজ্যের ছবির তুলনা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বহু পড়ুয়া রাতে অভিভাবকের অগোচরে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার করছে। রাত দেড়টা-দু’টোর আগে ঘুমোতে যাচ্ছে না তারা। ফলে পরের দিন স্কুল, পড়াশোনা এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় তার প্রভাব পড়ছে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে ইঙ্গিত, বিষয়টি শুধু পরিবারকে সচেতন করার মধ্যে আটকে রাখতে চান না তিনি। প্রয়োজন হলে সামাজিক এবং প্রশাসনিক স্তরেও পদক্ষেপ করার কথা ভাবা হতে পারে। যদিও সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেননি মুখ্যমন্ত্রী। বরং তাঁর বক্তব্যের মূল সুর,পড়ুয়ার হাতে প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু প্রযুক্তির হাতে যেন পড়ুয়া চলে না যায়।
এখানেই শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানের বক্তব্যে রাজনীতি ঢুকে পড়ে।
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, জনপ্রিয়তা কমার আশঙ্কা থাকলেও সমাজের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হওয়া উচিত নয়। শিক্ষার পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে কোনও কঠিন পদক্ষেপ প্রয়োজন হলে সেই ঝুঁকি নিতেও তিনি প্রস্তুত, এমন বার্তাই দেন তিনি। মোবাইলের প্রসঙ্গের পরেই শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ এবং আইনের নিয়ম কঠোর ভাবে মানা হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্ট এবং কলকাতা হাইকোর্টের সমস্ত নির্দেশিকা মেনেই নিয়োগ সম্পন্ন করা হবে। কোনও অনিয়মের সুযোগ দেওয়া হবে না। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় লিখিত পরীক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘‘কেবল মোবাইল ফোনে মেসেজ পাঠিয়ে আর চাকরি হবে না। লিখিত পরীক্ষার প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতেই যোগ্যতার নিরিখে চূড়ান্ত নিয়োগ করা হবে।’’
এখানেই থামেননি তিনি। শিক্ষক নিয়োগের ইন্টারভিউ বা মৌখিক পরীক্ষায় নম্বরের ওজন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, পূর্বতন সরকারের আমলে মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর রাখার ফলে পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। সেই ব্যবস্থা বদলানোর পক্ষে সওয়াল করে এসএসসি-কে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী।
তাঁর কথায়, লিখিত পরীক্ষার মেধার যথাযথ মূল্যায়নই হওয়া উচিত নিয়োগের মূল ভিত্তি। অর্থাৎ, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং মেধার উপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি পুরনো নিয়োগব্যবস্থার সমালোচনাও এ দিন স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি। কিন্তু শিক্ষক দিবসের মঞ্চে দিনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা সম্ভবত মোবাইল নিয়েই। কারণ, শিক্ষক-শিক্ষিকার হাতে শুধু পাঠ্যবই তুলে দিলেই যে পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা যায় না, তার ইঙ্গিত মিলেছে মুখ্যমন্ত্রীর কথায়। ঘরের ভিতরে রাত জেগে স্ক্রিনে চোখ আটকে থাকলে স্কুলের পড়াশোনাও যে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে, সেই আশঙ্কাই সামনে এনেছেন তিনি।
প্রযুক্তিকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং তার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করাই যে আসল চ্যালেঞ্জ, মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। কারণ মোবাইলেই এখন পড়াশোনা, খবর, যোগাযোগ, বিনোদন, সব কিছু। কিন্তু সেই একই যন্ত্র যখন ঘুম কেড়ে নেয়, মনোযোগ নষ্ট করে, তখন শিক্ষক-অভিভাবক-প্রশাসন—কার দায়িত্ব কতটা, সেই বিতর্কও নতুন করে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শিক্ষক দিবসের মঞ্চ থেকে তাই একসঙ্গে দু’টি বার্তা। এক দিকে স্বচ্ছ শিক্ষক নিয়োগের আশ্বাস, অন্য দিকে পড়ুয়ার হাতে মোবাইলের লাগাম টানার সতর্কতা।