নিউজ ডেস্ক: স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সাত দশক যে প্রান্তিক জনপদে পৌঁছায়নি পরিশ্রুত পানীয় জল, সেখানে নিজের হাতে জলের ধারা ছুটিয়ে গোটা দেশের নজর কেড়েছিলেন তিনি। উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুরের লাহুরিয়া দহ গ্রামের এক বৃদ্ধার আশীর্বাদকে যিনি নিজের সিভিল সার্ভিস জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করতেন, সেই জনপ্রিয় আইএএস আধিকারিক দিব্যা মিত্তল আচমকাই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গত ৩০ অগাস্ট সমাজমাধ্যমে দীর্ঘ ১৩ বছরের আমলাতান্ত্রিক কেরিয়ারে ইতি টানার কথা ঘোষণা করেন ২০১৩ ব্যাচের এই ইউপি ক্যাডার অফিসার। তাঁর এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই দেশ জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও জল্পনা তৈরি হয়েছে।
দিব্যার জীবনের যাত্রাপথ আর পাঁচজনের মতো সাদামাটা হলেও তাঁর সাফল্য নজরকাড়া। মধ্যবিত্ত পরিবারের এই মেধাবী কন্যা আইআইটি দিল্লি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে আইআইএম বেঙ্গালুরু থেকে এমবিএ করেন। এর পর লন্ডনে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা ‘জেপি মর্গ্যান’-এ আকর্ষণীয় বেতনের চাকরিতে যোগ দিলেও কর্পোরেট জীবনের ঘেরাটোপ তাঁকে তৃপ্তি দিতে পারেনি।
নিজের ভিতরের অপূর্ণতাকে দূর করে দেশসেবায় নামার তাগিদে বিদেশের মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে দেশে ফেরেন তিনি। ২০১৩ সালের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সর্বভারতীয় স্তরে ৬৮তম স্থান ছিনিয়ে নিয়ে উত্তরপ্রদেশ ক্যাডারের আইএএস অফিসার হিসেবে নিজের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করেন দিব্যা।
২০১৫ সালে মেরঠের অতিরিক্ত জেলাশাসক হিসেবে প্রশাসনিক দায়িত্ব নেওয়ার পর গোন্ডা, সন্ত কবীর নগর, মির্জাপুর এবং দেওরিয়ার মতো জেলায় গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন তিনি। তবে তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয় মির্জাপুরে জেলাশাসক থাকার সময়।
স্বাধীনতার ৭৬ বছর পর ২০২৩ সালের অগাস্টে পাহাড়ি লাহুরিয়া দহ গ্রামে যখন তাঁর উদ্যোগে প্রথম বার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানীয় জল পৌঁছায়, তখন স্থানীয়দের চোখে জল আর মুখে ছিল দিব্যার জয়গান। সেই স্মৃতিচারণা করে দিব্যা জানিয়েছেন, প্রশাসনিক সাফল্যের চেয়েও মানুষের সেই ভালোবাসা ছিল তাঁর কাছে অমূল্য।
তবে কর্মজীবনে বারবার বদলি হওয়ার কারণে নাকি এর নেপথ্যে অন্য কোনও প্রশাসনিক টানাপোড়েন রয়েছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। বিরোধীরা আমলাদের উপর অদৃশ্য চাপের অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি করলেও, দিব্যা নিজে সমাজমাধ্যমে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে তিনি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কারণেই এই পদক্ষেপ করেছেন।
পরিবারকে সময় দেওয়ার ইচ্ছাতেই তিনি সিভিল সার্ভিসকে জীবনের ‘একটি অধ্যায়’ হিসেবে দেখে ইতি টানছেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, দিব্যার স্বামী গগনদীপ সিংহ ঢিল্লোঁও আইআইটি ও আইআইএমের প্রাক্তন ছাত্র এবং প্রাক্তন সরকারি আধিকারিক। ২০২২ সালে তিনিও সরকারি চাকরি ছেড়ে বেসরকারি সংস্থায় ফিরে যান। স্বামীর পর এবার স্ত্রীর পদত্যাগ সেই জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, তাঁর এই স্বেচ্ছাবসরের আবেদনটি রাজ্য সরকারের ছাড়পত্র পাওয়ার পর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে পাঠানো হবে। তবে আইনি প্রক্রিয়া যাই হোক না কেন, নিশ্চিত ও প্রভাবশালী প্রশাসনিক পদ ছেড়ে এমন এক দক্ষ অফিসারের সরে দাঁড়ানো নিয়ে প্রশাসনিক এবং সাধারণ মহলে মধ্যে তৈরি হয়েছে কৌতূহল।