নিউজ ডেস্ক: দুর্গাপুজো মানেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনীর চিরপরিচিত রূপ। হাতে অস্ত্র, পায়ের নীচে অসুর—এই রূপেই দেবী দুর্গার আরাধনায় অভ্যস্ত বাঙালি। কিন্তু বাংলার বনেদি বাড়ির পুজোর ইতিহাসে এমন কিছু প্রাচীন রীতি ও দেবীমূর্তি রয়েছে, যা প্রচলিত ধারণার থেকে একেবারেই আলাদা। হাওড়ার এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারের দুর্গাপুজোয় দেখা যায় তেমনই এক ব্যতিক্রমী ‘অভয়মূর্তি’।
হাওড়া শিবপুর অঞ্চলে এই পুজো প্রায় সাড়ে তিনশত বছর পুরোনো। এই পুজোটি শুরু করেন পাল পরিবারের একজন পূর্বপুরুষ শ্রী সর্ব্বোস্ব পাল, সম্ভবত স্বপ্নাদেশ পেয়ে। তবে এই পুজোর জৌলুস বাড়ে এই বাড়ির অন্য একজন বিখ্যাত বঙ্গসন্তানের জন্য, যাকে আমরা শ্রী বটকৃষ্ণ পাল হিসেবে চিনি। ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি শিবপুরের এই বাড়িতেই জন্মগ্রহণ করেন। ইনি পরে কলকাতার এসে, ওষুদের ব্যাবসা করে বিখ্যাত হন। কলকাতার বি কে পাল এভিনিউ রাস্তাটি এনার নামেই। এছাড়াও শিবপুরের বি কে পাল স্কুলটিও তার নামাঙ্কিত।
এবার আসা যাক পুজোর প্রসঙ্গে। বর্তমানে তিন খিলানের ঠাকুরদালানটির খুব একটা রক্ষণাবেক্ষণ হয় না, কারণ দেখলাম শুধু চুনকাম করেই জীর্ণ দশা ঢাকা হয়েছে। এই বাড়িতে দেবীর 'অভয়া' রূপের আরাধনা হলেও, পুজো হয় শাক্তমতে। তাই এখানে দুর্গার দুটি হাত এবং তিনি অস্ত্রহীনা। দেবীর বাম হাতে আছে অভয়া মুদ্রা এবং ডান হাতে থাকে একটি ফল এবং একটি প্রস্ফুটিত পদ্মফুল। একচালা এই প্রতিমার বাহন সিংহ থাকলেও, কোনো অসুরের অস্তিত্ব নেই।
রথের দিন থেকে প্রাচীন কাঠামো পুজোর মধ্যে দিয়ে শুরু হয় পাল বাড়ির মূর্তি তৈরীর কাজ। দেবীর এখানে ডাকের সাজ। দুর্গাপুজোর নবমীর ঠিক ১৫ দিন আগে, কৃষ্ণনবমী তিথিতে বোধনের মাধ্যমে পুজোর সূচনা হয়, এবং প্রতিদিন চলতে থাকে চণ্ডীপাঠ। এখানে দেবীকে অন্নভোগ দেওয়া হয় না, তার বদলে ভোগ হয় লুচি মিষ্টি ও ফল দিয়ে।
সপ্তমীর দিন নবপত্রিকাকে গঙ্গাস্নান না করিয়ে, ঠাকুরদালানেই নবঘটের মাধ্যমে স্নান করানো হয়। অষ্টমীর সকালে এই বাড়িতে ধুনো পোড়ানোর প্রথা আছে, যেখানে বাড়ির মেয়েরা এবং প্রতিবেশিনীরাও অংশ নেন। শাক্তমতে পুজো বলে, এখানে বলিপ্রথা রয়েছে। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত পাঁঠাবলি এবং নবমীতে ফল বলির মাধ্যমে সেই প্রথা পালন করা হয়। এই বাড়ির সন্ধিপুজোর সময় কোনো নারীরা অংশগ্রহণ করতে পারেন না, এবং পুরো কাজ পরিবারের পুরুষেরা সম্পন্ন করেন। আগে আন্দুল রাজবাড়ীর কামান দাগার শব্দ শুনে সন্ধিপুজো শুরু হতো। কিন্তু এখন সেটা আর হয় না, কিন্তু আগের নিয়ম মেনেই হোম যজ্ঞ দিয়ে সন্ধিপুজোর সমাপ্তি ঘটে।
https://jazzbaat24bangla.news/news/deulghata-black-durga-purulia-ancient-temple-history
দশমীতে সিঁদুর খেলার ক্ষেত্রেও পাল বাড়িতে, দেবীকে বরণ না করেই শুধু সিঁদুর ছুঁইয়ে, বাড়ির মেয়েরা সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন। তারপর বাড়ির ছেলেরা মিলে (লোক অভাবে এখন লরি করে) শিবপুরের ঘাটে প্রতিমা বিসর্জনের দেন।
এই পুজো দেখতে আসতে হলে, মন্দিরতলা বাসস্টপে নেমে টোটো বা রিক্সায় চেপে পাল বাড়ি। অবশ্য পায়ে হেঁটেও নবগোপাল মুখার্জী লেনের পাল বাড়ি মাত্র মিনিট দশেকের রাস্তা ।
ঠিকানা - ৩৮ , নবগোপাল মুখার্জি লেন , শিবপুর , হাওড়া - ৭১১১০২
