স্বাধীনতা দিবসের সকালে লালকেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণে এ বার নজর শুধু অতীতের সাফল্যে নয়, আগামী ভারতের প্রস্তুতিতে। যুবসমাজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, শিক্ষা, খেলাধুলা, সেমিকন্ডাক্টর এবং পরমাণু শক্তি—ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে একগুচ্ছ ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী। লক্ষ্য একটাই—২০৪৭-এর ‘বিকশিত ভারত’-এর ভিত এখন থেকেই আরও শক্ত করা।
AI-তে এক কোটি যুবক, প্রযুক্তির দৌড়ে নেতৃত্বের লক্ষ্য
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ভারতকে শুধু AI ব্যবহারকারী দেশ হিসাবে দেখতে চান না মোদী। আগামী এক বছরে এক কোটি যুবক-যুবতীকে AI-তে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ঘোষণা তাঁর ভাষণের অন্যতম বড় আকর্ষণ। তরুণদের ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির জন্য প্রস্তুত করাই এর লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল সুর—বিশ্ব যখন AI-নির্ভর অর্থনীতির দিকে দ্রুত এগোচ্ছে, তখন ভারতের জনসংখ্যাগত সুবিধাকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে হবে। কোটি তরুণকে AI-র সঙ্গে পরিচিত করে সেই সম্ভাবনাকেই কাজে লাগাতে চাইছে কেন্দ্র।
মেধার সামনে টাকা যেন বাধা না হয়
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বেসরকারি কোচিংয়ের বিপুল খরচ বহু পরিবারের কাছে বড় সমস্যা। সেই জায়গায় বিনামূল্যে অনলাইন কোচিংয়ের ব্যবস্থা করার কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী।
লক্ষ্য, বড় শহরের নামী কোচিং প্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা ছাত্রছাত্রীদেরও মানসম্মত প্রস্তুতির সুযোগ দেওয়া। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার মেধাবী পড়ুয়ারা যাতে শুধুমাত্র আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পিছিয়ে না পড়েন, সেই ব্যবধান কমানোর বার্তাই রয়েছে এই ঘোষণায়।
৫ থেকে ১৫ বছরেই খোঁজ প্রতিভার
খেলার মাঠেও নতুন অভিযান। দেশের ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে ক্রীড়া প্রতিভা খুঁজে বার করার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন মোদী। গ্রাম, মফস্সল থেকে শহর—সব জায়গা থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় চিহ্নিত করে তাঁদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের আওতায় আনার লক্ষ্য।
ভারতের বহু প্রতিভা সুযোগের অভাবে হারিয়ে যায়। ছোট বয়সেই তাদের শনাক্ত করে প্রশিক্ষণ, পরিকাঠামো এবং প্রতিযোগিতার সুযোগ দিতে পারলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও বেশি ভারতীয় খেলোয়াড় উঠে আসবেন—এই ভাবনাই উদ্যোগটির কেন্দ্রে।
চিপের জন্য বিদেশের মুখাপেক্ষী নয়
আধুনিক অর্থনীতির ‘নতুন তেল’ বলা হয় সেমিকন্ডাক্টরকে। মোবাইল ফোন থেকে গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম—প্রায় সব ক্ষেত্রেই চিপ অপরিহার্য। তাই সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে আত্মনির্ভর হওয়ার লক্ষ্যে বড় পদক্ষেপের কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী।
দেশে ইতিমধ্যেই সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের পরিকাঠামো তৈরি হচ্ছে। আগামী এক-দু’বছরে আরও ৭-৮টি প্ল্যান্ট গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। চিপ উৎপাদনে ভারতের অবস্থান শক্ত করা হলে শুধু আমদানিনির্ভরতা কমবে না, তৈরি হবে বিপুল কর্মসংস্থানও।
পরমাণু শক্তিতে বিরাট লাফ
শক্তি নিরাপত্তার প্রশ্নেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা সামনে এনেছেন মোদী। ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ১০০ গিগাওয়াটে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন তিনি।
আগামী দিনে শিল্প, পরিবহণ, শহর এবং ডিজিটাল পরিষেবার সঙ্গে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়বে। সেই বাড়তি চাহিদা মেটাতে পরমাণু শক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসাবে গড়ে তুলতে চাইছে কেন্দ্র। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমানোও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
জরুরি পরিস্থিতিতে নাগরিক সুরক্ষা
ষষ্ঠ ঘোষণায় উঠে এসেছে নাগরিক প্রতিরক্ষা বা সিভিল ডিফেন্স ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়টি। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা বড় ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে দ্রুত সুরক্ষা দেওয়ার জন্য আরও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
অর্থাৎ দেশের নিরাপত্তাকে শুধু সীমান্তরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ নাগরিকের প্রস্তুতি ও সুরক্ষাকেও বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসাবে দেখার ইঙ্গিত মিলেছে তাঁর ভাষণে।
আজকের যুবকই ২০৪৭-এর কারিগর
ছয় ঘোষণার দিকে একসঙ্গে তাকালে স্পষ্ট, মোদীর এবারের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণের কেন্দ্রে রয়েছে ‘ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি’। AI-তে এক কোটি যুবকের প্রশিক্ষণ, মেধাবীদের বিনামূল্যে কোচিং, ছোট বয়সে ক্রীড়া প্রতিভার সন্ধান, দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, পরমাণু শক্তির বিস্তার এবং নাগরিক সুরক্ষার আধুনিকীকরণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের ছাপ।
লালকেল্লা থেকে তাই মোদীর বার্তা শুধু স্বাধীনতার উদ্যাপন নয়। ২০৪৭-এর ভারত কেমন হবে, তার ভিত আজ থেকেই গড়ে তুলতে হবে—এই লক্ষ্যেই প্রযুক্তি, প্রতিভা এবং আত্মনির্ভরতাকে সামনে রেখে ছয়টি বড় ঘোষণা।