নিউজ ডেস্ক: আমেরিকার ধনকুবের প্রযুক্তি উদ্যোগপতি ইলন মাস্কের প্রশংসায় পঞ্চমুখ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মহাকাশে হাজার হাজার কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটানোর জন্য মাস্ককে ‘সত্যিকারের প্রতিভাবান’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। তবে এই প্রশংসার নেপথ্যে রয়েছে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট-ভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবা স্টারলিঙ্কের সঙ্গে পাল্লা দিতে নিজেদের উপগ্রহ-যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে রাশিয়া। সেই লক্ষ্যেই মস্কোর এই উদ্যোগের তাৎপর্য নতুন করে সামনে এসেছে।
মহাকাশ প্রযুক্তিতে রাশিয়ার অগ্রগতি নিয়ে আলোচনার সময় মাস্কের প্রসঙ্গ তোলেন পুতিন। মহাকাশে বিপুল সংখ্যক উপগ্রহ পাঠানোর ক্ষেত্রে মাস্কের সাফল্যের কথা উল্লেখ করে রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, মাস্ক সত্যিই প্রতিভাবান। তাঁর সংস্থা স্পেসএক্সের তৈরি স্টারলিঙ্ক নেটওয়ার্ক ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে স্যাটেলাইট-ভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে। অন্য দিকে, এই ক্ষেত্রে রাশিয়াকে এখনও অনেকটা পথ এগোতে হবে।
পুতিনের এই মন্তব্যের পিছনে রয়েছে মহাকাশ-প্রযুক্তিতে রাশিয়ার নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা। দীর্ঘদিন ধরেই মহাকাশ গবেষণায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে মস্কোর। কিন্তু দ্রুতগতির স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবার ক্ষেত্রে স্টারলিঙ্কের মতো বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তৈরি করা এখনও রাশিয়ার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই ঘাটতি মেটাতেই নিজস্ব উপগ্রহ-যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
রাশিয়ার প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের নাম ‘রাসভেত’। রুশ ভাষায় যার অর্থ ভোরের আলো। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ইন্টারনেট পরিষেবার পাশাপাশি সামরিক ক্ষেত্রেও যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে চায় মস্কো। রাশিয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী, কক্ষপথে একাধিক উপগ্রহ পাঠিয়ে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যার সাহায্যে প্রত্যন্ত এলাকাতেও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। তবে স্টারলিঙ্কের বিশাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে রাশিয়াকে উপগ্রহ উৎক্ষেপণ, প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো এবং পরিষেবার বিস্তার—সব ক্ষেত্রেই বড়সড় অগ্রগতি করতে হবে।
পুতিনের বক্তব্যে উঠে এসেছে মহাকাশে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও। তাঁর দাবি, মহাকাশে একে অপরের কাজে যাতে বিঘ্ন না ঘটে, তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণে আমেরিকার অংশীদারদের সঙ্গে, এমনকি মাস্কের সঙ্গেও যোগাযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট। যদিও এই যোগাযোগের পরিধি কতটা বিস্তৃত, কিংবা রাশিয়ার উপগ্রহ-ইন্টারনেট প্রকল্প নিয়ে মাস্কের সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনও আলোচনা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।
কিন্তু পুতিনের এই মন্তব্যের সময়কালই ঘটনাটিকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। ইউক্রেনের যুদ্ধে স্টারলিঙ্কের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ বজায় রাখা, সেনার মধ্যে তথ্য আদানপ্রদান এবং ড্রোন পরিচালনার ক্ষেত্রে এই স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে একটি বেসরকারি প্রযুক্তি সংস্থার হাতে থাকা যোগাযোগ পরিকাঠামো কী ভাবে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিতে প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্টারলিঙ্কের গুরুত্ব শুধু বাণিজ্যিক ইন্টারনেট পরিষেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রথাগত যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সংযোগ বজায় রাখা সম্ভব। যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো পরিস্থিতিতে এই প্রযুক্তি বিশেষ কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে, সামরিক ক্ষেত্রে এর ব্যবহার প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ইউক্রেনের যুদ্ধ সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইউক্রেনের যোগাযোগ ব্যবস্থায় স্টারলিঙ্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অন্য দিকে, পরিষেবার নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারের শর্ত নিয়ে মাস্কের সংস্থার সঙ্গে ইউক্রেনের সম্পর্কও একাধিক বার আলোচনায় এসেছে। ফলে স্যাটেলাইট-ভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন আর কেবল প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সামরিক কৌশলেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই পরিস্থিতিতে মাস্কের প্রশংসা করে পুতিন আসলে কী বার্তা দিতে চেয়েছেন, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এক দিকে, রাশিয়া স্টারলিঙ্কের বিকল্প নিজস্ব নেটওয়ার্ক তৈরি করতে চাইছে। অন্য দিকে, ইউক্রেনের যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক সংঘাতে উপগ্রহ-ভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুধু ইন্টারনেট পরিষেবা নয়, সামরিক যোগাযোগ, নজরদারি এবং ড্রোন পরিচালনার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে।
তবে মাস্কের প্রশংসা করলেই যে রাশিয়ার সঙ্গে তাঁর প্রযুক্তিগত সহযোগিতার কোনও নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই। পুতিনের বক্তব্য থেকে আপাতত স্পষ্ট, মহাকাশে উপগ্রহ-ভিত্তিক যোগাযোগের গুরুত্ব সম্পর্কে মস্কো যথেষ্ট সচেতন। স্টারলিঙ্কের মতো একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য রাশিয়া নিজস্ব উদ্যোগ বাড়াতে চাইছে।
প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা থেকে কৌশলগত লড়াই— স্যাটেলাইট ইন্টারনেটকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সমীকরণ ক্রমশ জটিল হচ্ছে। মাস্কের স্টারলিঙ্ক সেই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে। আর পুতিনের প্রশংসা বুঝিয়ে দিচ্ছে, মহাকাশে যোগাযোগের পরিকাঠামো গড়ে তোলার লড়াইয়ে রাশিয়াও পিছিয়ে থাকতে চাইছে না।




