চাকরির ইন্টারভিউ। সামনে একের পর এক প্রশ্ন। প্রত্যাশিত ছিল প্রশাসনিক দক্ষতা, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা, বিপুল ভিড় সামলানোর অভিজ্ঞতা, মন্দির পরিচালনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। কিন্তু প্রশ্নের তালিকা সেখানেই থামল না। আচমকাই এল—জেনেউ পরেন? শিখা রাখেন? আমিষ খান? মদ্যপান করেন? নিজেকে নিষ্ঠাবান হিন্দু মনে করেন? অযোধ্যার রামমন্দিরের প্রথম পূর্ণ সময়ের CEO বাছাইয়ের সাক্ষাৎকারে এমনই ব্যক্তিগত এবং ধর্মীয় প্রশ্ন ঘিরে এখন তুমুল চর্চা। মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া এই সাক্ষাৎকারে ৫২০০-রও বেশি আবেদনকারীর মধ্য থেকে বাছাই করা ১৮ জনের সামনে রাখা হয়েছে প্রশ্নগুলি।
সাক্ষাৎকারের খবর প্রকাশ্যে আসতেই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—একটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক প্রধান বাছাইয়ে একজন প্রার্থীর খাদ্যাভ্যাস, মদ্যপানের অভ্যাস কিংবা জেনেউ পরার সঙ্গে তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতার সম্পর্ক কোথায়? আবার ট্রাস্টের নিয়োগ-প্রক্রিয়ার অন্য দিক বলছে, এটি সাধারণ কোনও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের CEO-র পদ নয়। রামমন্দিরের ধর্মীয় পরিবেশ, আচার-অনুশাসন এবং কোটি কোটি মানুষের আবেগের সঙ্গে যাঁকে প্রতিদিন কাজ করতে হবে, তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও জীবনযাপনও নিয়োগের বিবেচনায় এসেছে।
৫২০০ থেকে ১৮—অযোধ্যায় শুরু ‘শেষ পরীক্ষা’
শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্টের প্রথম পূর্ণ সময়ের CEO নিয়োগের জন্য আবেদন চাওয়া হয়েছিল জুলাইয়ে। কয়েক সপ্তাহের বাছাই পর্বের পর প্রায় ৫২০০ আবেদন থেকে ১৮ জনকে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়েছে। ১১ অগস্ট অযোধ্যায় শুরু হয় সেই সাক্ষাৎকার। প্রার্থীদের প্রত্যেকের সঙ্গে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ মিনিট করে কথা বলা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। বাছাই কমিটি শেষ পর্যন্ত তিন জনের নাম সুপারিশ করবে; তাঁদের মধ্যে থেকেই ট্রাস্ট চূড়ান্ত প্রার্থী বেছে নেবে।
এই ১৮ জনের তালিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। রয়েছেন প্রাক্তন IAS, IPS এবং সামরিক আধিকারিকেরা। অর্থাৎ, ট্রাস্ট যে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে খুঁজছে না, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও যে বড় মাপকাঠি—প্রার্থীদের প্রোফাইলেই তার ইঙ্গিত মিলছে।
‘শিখা আছে? জেনেউ পরেন?’—প্রশ্নের কেন্দ্রে ধর্মীয় পরিচয়
ইন্টারভিউয়ের আগে প্রার্থীদের একটি ৩৪ দফার গুগল ফর্ম পূরণ করতে হয়েছিল। সেখানে ব্যক্তিগত, পেশাগত এবং ধর্মীয় পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছিল। সাক্ষাৎকারে সেই প্রসঙ্গই আরও নির্দিষ্ট প্রশ্নে ফিরে আসে।
প্রার্থীদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, তাঁরা শিখা রাখেন কি না, জেনেউ পরেন কি না, নিরামিষ না আমিষ খান, মদ্যপান করেন কি না। এমনকি নিজেকে কতটা ‘নিষ্ঠাবান হিন্দু’ বলে মনে করেন, সেই প্রশ্নও করা হয়েছে বলে খবর।
অর্থাৎ, প্রার্থী কী ভাবে একটি বড় প্রতিষ্ঠান চালাবেন, তার পাশাপাশি তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মীয় অনুশাসন কতটা মেনে চলেন, সেটিও আলোচনায় এসেছে। এখানেই তৈরি হয়েছে বিতর্কের জায়গা।
CEO পদটি আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
রামমন্দিরের CEO কোনও আনুষ্ঠানিক পদ নয়। এই পদে যিনি বসবেন, তিনিই ট্রাস্টের প্রশাসনিক ব্যবস্থার সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্তাদের অন্যতম হবেন। মন্দিরের দৈনন্দিন পরিচালনা, বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর ব্যবস্থাপনা, কর্মী ও পরিষেবা, নিরাপত্তা-সমন্বয়, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা—সবকিছুর সঙ্গে এই পদ জড়িত।
অযোধ্যায় প্রতিদিন যে বিপুল ভিড় হয়, আগামী দিনে মন্দিরকে ঘিরে যে আরও বড় ধর্মীয় ও পর্যটন পরিকাঠামো তৈরি হওয়ার কথা, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করাও CEO-র বড় দায়িত্ব হতে পারে। তাই সাক্ষাৎকারে প্রার্থীদের রামমন্দির পরিচালনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছে।
শুধু ‘রামভক্ত’ হলেই হবে না
তবে নিয়োগের শর্তেই বোঝা গিয়েছিল, এই পদে শুধুমাত্র কর্পোরেট অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়। জুলাইয়ে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রার্থীর বয়স হতে হবে ৫০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে এবং অন্তত ২০ বছরের প্রশাসনিক বা ম্যানেজমেন্ট অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তাঁকে অযোধ্যায় থেকে দায়িত্ব পালন করতেও প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রাথমিক নিয়োগের মেয়াদ তিন বছর।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত—প্রার্থীকে সক্রিয় ভাবে হিন্দু ধর্ম পালনকারী এবং রামের ভক্ত হতে হবে। ফলে ধর্মীয় পরিচয় যে এই নিয়োগে প্রথম থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, তা স্পষ্ট।
অনুদান বিতর্কের পরেই কেন CEO?
এই নিয়োগের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। রামমন্দিরের অনুদান নিয়ে বিতর্ক এবং মন্দিরের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগের আবহেই ট্রাস্ট প্রথম পূর্ণ সময়ের CEO নিয়োগের পথে হাঁটছে। ফলে মন্দিরের প্রশাসনে আরও পেশাদার এবং কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাপনা তৈরির প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
বিশাল পরিমাণ অনুদান, বিপুল সম্পত্তি, প্রতিদিনের দর্শনার্থীর চাপ, নিরাপত্তা এবং পরিষেবা—সব মিলিয়ে রামমন্দির এখন শুধু একটি তীর্থস্থান নয়, একটি বিশাল প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানও। সেই প্রতিষ্ঠানের অর্থ ও প্রশাসনকে আরও সংগঠিত করাই CEO নিয়োগের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
বিতর্কটা ঠিক কোথায়?
এখানেই প্রশ্নটা অন্য মাত্রা পেয়েছে। একজন মানুষ আমিষ খান কি না, মদ্যপান করেন কি না, জেনেউ পরেন কি না—তা কি তাঁর প্রশাসনিক সততা বা দক্ষতার মাপকাঠি হতে পারে? এক দিকে রয়েছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মূল্যবোধ এবং সেই মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নেতৃত্বের যুক্তি। অন্য দিকে রয়েছে পেশাদার প্রশাসনের প্রশ্ন।
রামমন্দিরের ক্ষেত্রে এই দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট। কারণ, মন্দিরটি যেমন কোটি কোটি মানুষের ধর্মীয় আবেগের কেন্দ্র, তেমনই তার প্রশাসনকে প্রতিদিন সামলাতে হয় আধুনিক ব্যবস্থাপনার জটিলতা। ফলে CEO-র কাছে ধর্মীয় অনুশাসন এবং প্রশাসনিক দক্ষতা—দুইয়েরই প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারের প্রশ্ন তাই নিছক ‘অদ্ভুত’ প্রশ্নের তালিকা হয়ে থাকছে না। বরং তা সামনে এনে দিয়েছে আরও বড় প্রশ্ন—রামমন্দিরের প্রশাসনের ভবিষ্যৎ চরিত্র কী হবে? ধর্মীয় মূল্যবোধ আগে, না পেশাদার প্রশাসন? নাকি দু’টিকে পাশাপাশি রেখেই তৈরি হবে নতুন মডেল?
৫২০০-র বেশি আবেদন থেকে ১৮ জনের বাছাই। তাঁদের মধ্যে প্রাক্তন আমলা, পুলিশকর্তা, সামরিক আধিকারিক। এখন তিন জনের নাম যাবে ট্রাস্টের কাছে। শেষ পর্যন্ত যিনি দায়িত্ব নেবেন, তাঁর সামনে শুধু একটি মন্দির পরিচালনার দায়িত্ব থাকবে না—থাকবে বিশ্বাস, অর্থ, প্রশাসন এবং কোটি কোটি ভক্তের প্রত্যাশাকে একই সুতোয় বাঁধার কঠিন পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষার প্রথম দরজায় ইতিমধ্যেই জিজ্ঞাসা করা হয়ে গিয়েছে—“জেনেউ পরেন?”