নয়াদিল্লি: অপারেশন থিয়েটারে ঢুকেছেন রোগী। সামনে বিশাল এক যন্ত্র, তার কয়েকটি হাত ছড়িয়ে রয়েছে শরীরের চার পাশে। কোথাও ক্যামেরা, কোথাও সূক্ষ্ম অস্ত্র। দূরে বসে চিকিৎসক তাকিয়ে রয়েছেন একটি স্ক্রিনের দিকে। দেখে মনে হতে পারে, এ বার বুঝি ডাক্তার নয়, যন্ত্রই অপারেশন করবে! রোবোটিক সার্জারি নিয়ে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটাই এখান থেকে। রোবট নিজে কোনও রোগীর শরীরে অপারেশন করে না। আধুনিক রোবোটিক সার্জারিতে শেষ সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে অস্ত্রের প্রতিটি নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করেন প্রশিক্ষিত সার্জন।
রোবট আসলে চিকিৎসকের হাত ও চোখের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত সম্প্রসারণ। অর্থাৎ, অপারেশন থিয়েটারে যন্ত্রটি যতই অত্যাধুনিক হোক, নিয়ন্ত্রণ থাকে মানুষের হাতেই। সার্জন সাধারণত রোগীর পাশে একটি কনসোলে বসেন। সেখানে শরীরের ভিতরের অংশের বড় করে, ত্রিমাত্রিক ছবি দেখা যায়। হাতে থাকা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সাহায্যে চিকিৎসক সূক্ষ্ম যন্ত্রগুলিকে নাড়ান।
রোবোটিক সিস্টেম সেই হাতের নড়াচড়াকে আরও সূক্ষ্ম ও নিয়ন্ত্রিত গতিতে অস্ত্রের কাছে পৌঁছে দেয়।
এই প্রযুক্তির বড় সুবিধা হল, মানুষের হাত যেখানে পৌঁছতে বা ঘুরতে সমস্যায় পড়তে পারে, রোবোটিক যন্ত্রের সূক্ষ্ম এবং নমনীয় অস্ত্র সেখানে কাজ করতে পারে। চিকিৎসক শরীরের ভিতরের অংশকে বড় করে দেখতে পারেন এবং ছোট জায়গায় অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভাবে কাজ করার সুযোগ পান। NCI-র ব্যাখ্যাতেও রোবোটিক ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারিতে ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে ক্যামেরা ও যন্ত্র ঢুকিয়ে 3D দৃশ্যের সাহায্যে অস্ত্রোপচারের কথা বলা হয়েছে।
রোগীর কাছে এর অর্থ কী?
প্রথমত, অনেক ক্ষেত্রে বড় করে কেটে অস্ত্রোপচার করার বদলে কয়েকটি ছোট ছিদ্র দিয়ে কাজ করা সম্ভব হয়। এই ধরনের minimally invasive surgery-তে সাধারণত ক্ষত ছোট হয় এবং ব্যথা, দাগ ও সুস্থ টিস্যুর ক্ষতি কম হতে পারে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও থাকে।
অপারেশনের সময় রক্তক্ষরণ কম হওয়া, শরীরে তুলনামূলক কম ধকল যাওয়া এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমার মতো সুবিধাও কিছু ক্ষেত্রে পাওয়া যেতে পারে। তবে কোন রোগীর ক্ষেত্রে কতটা সুবিধা হবে, তা নির্ভর করে অস্ত্রোপচারের ধরন, রোগীর শারীরিক অবস্থা, রোগের জটিলতা এবং চিকিৎসকের দক্ষতার উপর। রোবোটিক সার্জারি মানেই প্রত্যেক রোগীর জন্য একই ফল—এমন নয়।
আর একটি সুবিধা চিকিৎসকের জন্য। দীর্ঘ সময় ধরে সরাসরি রোগীর শরীরের উপর ঝুঁকে কাজ করলে সার্জনের শারীরিক ক্লান্তি হতে পারে। রোবোটিক সিস্টেমে চিকিৎসক তুলনামূলক আরামদায়ক অবস্থানে বসে কনসোলের মাধ্যমে অস্ত্র পরিচালনা করতে পারেন। হাতের স্বাভাবিক সামান্য কাঁপুনিও সিস্টেমের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ করা যায় বলে সূক্ষ্ম কাজের ক্ষেত্রে সুবিধা হতে পারে।
কিন্তু এখানেই থামলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কারণ রোবোটিক সার্জারি মানেই ‘নিরাপদে শতভাগ সফল অপারেশন’ নয়। যন্ত্র যত আধুনিকই হোক, রোগীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে সার্জনের অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, হাসপাতালের পরিকাঠামো এবং অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা। চিকিৎসককেই ঠিক করতে হয় কোন পদ্ধতি রোগীর জন্য উপযুক্ত।
রোবোটিক পদ্ধতিতে অপারেশন হলেও সাধারণ অস্ত্রোপচারের মতোই জটিলতা দেখা দিতে পারে। রক্তক্ষরণ, সংক্রমণ, আশপাশের টিস্যুর ক্ষতি কিংবা অ্যানেস্থেশিয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া—কোনও ঝুঁকিই প্রযুক্তির কারণে শূন্য হয়ে যায় না। কোন ঝুঁকি কতটা, তা নির্ভর করে নির্দিষ্ট অস্ত্রোপচার ও রোগীর পরিস্থিতির উপর।
তাহলে রোগীকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কী জানতে হবে?
শুধু হাসপাতালের দরজায় ‘Robotic Surgery Available’ লেখা দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। চিকিৎসককে জিজ্ঞাসা করা দরকার—এই অস্ত্রোপচারে রোবোটিক পদ্ধতির প্রয়োজন আছে কি না, প্রচলিত বা ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতির বিকল্প কী, সম্ভাব্য সুবিধা ও ঝুঁকি কী, সার্জনের এই নির্দিষ্ট অস্ত্রোপচারে কতটা অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং সুস্থ হতে আনুমানিক কত সময় লাগতে পারে। চিকিৎসা বেছে নেওয়ার আগে এই প্রশ্নগুলি করা গুরুত্বপূর্ণ।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আর একটি বড় প্রশ্ন, খরচ। বহু বছর ধরে রোবোটিক সার্জারি ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রযুক্তি। দামি আমদানি করা যন্ত্র এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচের কারণে এই পরিষেবা মূলত বড় শহরের কিছু হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে সাধারণ রোগীর নাগালের বাইরে থেকে যেত অনেক ক্ষেত্রে।
এখন ছবিটা কিছুটা বদলানোর চেষ্টা চলছে। ভারতে দেশীয় প্রযুক্তিতে রোবোটিক সার্জারি সিস্টেম তৈরি হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে প্রযুক্তির খরচ কমিয়ে আরও বেশি হাসপাতাল এবং রোগীর কাছে এই পরিষেবা পৌঁছনোর সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সবচেয়ে চমকপ্রদ সম্ভাবনাটি অবশ্য আরও দূরে—টেলিসার্জারি। অর্থাৎ চিকিৎসক এক জায়গায় বসে দূরে থাকা রোগীর অস্ত্রোপচারে রোবোটিক সিস্টেমের মাধ্যমে সাহায্য করতে পারেন। উচ্চগতির যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং রোবোটিক প্রযুক্তির উন্নতির ফলে এমন সম্ভাবনা আর কেবল বিজ্ঞান-কল্পকাহিনি নয়। তবে বাস্তবে এই ধরনের ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কঠোর চিকিৎসা-নিরাপত্তা প্রোটোকল প্রয়োজন।
ভাবুন, কোনও প্রত্যন্ত এলাকার রোগীকে জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য বার বার বড় শহরে ছুটতে হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দক্ষতা দূরে বসেও পৌঁছে যেতে পারে তাঁর কাছে। এখনও এই প্রযুক্তি সর্বত্র সহজলভ্য নয়, কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দিকগুলির মধ্যে এটি অন্যতম। তবে রোগীর কাছে শেষ কথা প্রযুক্তি নয়। রোবট নয়, চিকিৎসকই সিদ্ধান্ত নেন। রোবট যত উন্নতই হোক, রোগ নির্ণয়, অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ, কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে এবং অপারেশনের সময় কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সবকিছুর কেন্দ্রে থাকেন মানুষই।
তাই ‘রোবোটিক সার্জারি’ শুনে ভয় পাওয়ারও কারণ নেই, আবার শুধুমাত্র আধুনিক প্রযুক্তির নাম শুনে চোখ বন্ধ করে ভরসা করারও কারণ নেই। রোগীর জন্য আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমার রোগের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি কতটা উপযুক্ত, কী সুবিধা মিলতে পারে, কী ঝুঁকি রয়েছে এবং কে অস্ত্রোপচারটি করছেন? কারণ অপারেশন থিয়েটারে রোবট থাকলেও শেষ পর্যন্ত রোগীর জীবন ও সিদ্ধান্তের দায়িত্ব মানুষের হাতেই।