নয়াদিল্লি: গালওয়ান উপত্যকায় ভারত-চিন সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে তৈরি সলমন খানের ছবি। প্রথমে নাম ছিল ‘ব্যাটল অফ গালওয়ান’। পরে সেই ছবিরই নাম বদলে হয়েছে ‘মাতৃভূমি: মে ওয়ার রেস্ট ইন পিস’। শুধু নাম বদল নয়, ছবির গল্প ও উপস্থাপনাতেও বড়সড় পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে দাবি। এমনকি ছবির প্রায় ৪০ শতাংশ অংশ নতুন করে শুটিং করা হয়েছে বলেও সরকারি সূত্রের দাবি। কারণ, বেজিংয়ের সঙ্গে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কের সাম্প্রতিক উন্নতি। চিনকে নেতিবাচক ভাবে দেখানো নিয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের আপত্তি ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। যদিও এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন ছবির নায়ক সলমন খান। তাঁর বক্তব্য, সরকার কোনও চাপ দেয়নি। ছবির গল্প নিয়ে ছড়ানো এই সব কথাই ‘আজগুবি’।
শুক্রবার মুম্বইয়ে ‘মাতৃভূমি’র ট্রেলার প্রকাশ অনুষ্ঠানে ছবির চিত্রনাট্য বদল এবং সরকারি হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন সলমন। অভিনেতার দাবি, ছবিটি কোনও দেশের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচার করার জন্য তৈরি হয়নি। বরং যুদ্ধের পরিস্থিতিতে দুই দেশের সেনাদের জীবন, তাঁদের আত্মত্যাগ এবং পরিবারের যন্ত্রণা তুলে ধরাই নির্মাতাদের উদ্দেশ্য। সলমনের কথায়, “আমরা দুই দিকের সেনা এবং তাঁদের পরিবারের কথা দেখিয়েছি। এখানে কোনও পক্ষকে নেতিবাচক ভাবে তুলে ধরা হয়নি। পরিস্থিতিটাই নেতিবাচক।”
সরকারের চাপে চিত্রনাট্য বদলানোর অভিযোগও সরাসরি নাকচ করেছেন তিনি। সলমনের বক্তব্য, ভারত-চিন সম্পর্ক খারাপ করার মতো কোনও উদ্দেশ্য ছবির ছিল না। যুদ্ধের কাহিনিতে দুই দেশের সেনা থাকলেই যে ছবিটি কোনও একটি দেশের বিরুদ্ধে যাবে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। তাঁর কথায়, দেশের স্বার্থই সেনাদের কাছে সবার আগে। ব্যক্তিগত স্তরে বিপক্ষের সেনার সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও যুদ্ধের পরিস্থিতিতে দায়িত্বই তাঁদের কাছে বড় হয়ে ওঠে।
তবে ছবির পরিচালক অপূর্ব লাখিয়ার প্রথম পরিকল্পনা যে আলাদা ছিল, সে কথা কার্যত স্বীকার করেছেন সলমন। ট্রেলার প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি জানান, পরিচালকের ছবিটি নিয়ে গোড়ার দিকে অন্য ভাবনা ছিল। পরে গল্পের বিবর্তন ঘটেছে। যদিও সেই পরিবর্তনের পিছনে সরকারি চাপের অভিযোগ তিনি মানতে চাননি।
সরকারি সূত্রের দাবি, বদলেছে ছবির প্রায় ৪০ শতাংশ
অন্য দিকে, সরকারি সূত্রের দাবি, ‘ব্যাটল অফ গালওয়ান’ নামে ছবিটির প্রথম পরিকল্পনায় চিনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু ভারত-চিনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতির প্রেক্ষিতে সেই উপস্থাপনা নিয়ে আপত্তি ওঠে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তরফেও মূল চিত্রনাট্য নিয়ে প্রশ্ন ছিল বলে দাবি। তার পরেই ছবির নাম বদল, গল্পের পুনর্বিন্যাস এবং একাধিক দৃশ্য নতুন করে শুটিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ছবির প্রায় ৪০ শতাংশ অংশ নতুন করে শুট করা হয়েছে বলেও দাবি সূত্রের।
গত অক্টোবরে ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীও অভিযোগ করেছিলেন, চিনের সঙ্গে সম্পর্কের কথা মাথায় রেখে ছবির চিত্রনাট্য ও দৃশ্য বদলাতে নির্মাতাদের উপর চাপ তৈরি করা হয়েছিল। তাঁর দাবি ছিল, চিনকে তুলনামূলক ইতিবাচক ভাবে দেখানোর জন্য ছবির বেশ কিছু অংশ নতুন করে তৈরি করতে হয়েছে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে কোনও সরকারি স্বীকৃতি বা প্রকাশ্য নথি সামনে আসেনি।
এর আগে ছবিটির টিজার নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যম ‘গ্লোবাল টাইমস’। তাদের অভিযোগ ছিল, ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের ঘটনাকে ছবিতে বিকৃত ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে ছবিটি ঘিরে ভারত-চিন সম্পর্ক এবং ইতিহাসের উপস্থাপন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়।
ছবি থেকে সরে দাঁড়ালেন বইয়ের দুই লেখক
এই বিতর্কের মধ্যেই বুধবার ছবির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা ঘোষণা করেছেন শিব অরুর ও রাহুল সিং। তাঁদের লেখা ‘ইন্ডিয়াজ মোস্ট ফিয়ারলেস’ বইয়ের একটি বিবরণকে কেন্দ্র করেই ছবিটির প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল বলে জানা যায়। দুই লেখকের দাবি, ছবির গল্প ক্রমশ তাঁদের বইয়ে বর্ণিত গালওয়ান সংঘর্ষের বিবরণ থেকে সরে গিয়েছে। তাই তাঁরা আর এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান না।
২০২০ সালের জুনে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চিনের সেনাদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়েছিল। সেই ঘটনায় ২০ জন ভারতীয় সেনার মৃত্যু হয়। দীর্ঘ কয়েক দশকের মধ্যে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় দুই দেশের সেনাদের মধ্যে সেটিই ছিল অন্যতম গুরুতর সংঘর্ষ। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রথমে ‘ব্যাটল অফ গালওয়ান’ নামে ছবির ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৫ সালের জুলাইয়ে। পরে নাম বদলে রাখা হয় ‘মাতৃভূমি: মে ওয়ার রেস্ট ইন পিস’।
৪ ডিসেম্বর মুক্তি, বিতর্কের মধ্যেই ট্রেলার
সলমন ও চিত্রাঙ্গদা সিং অভিনীত ছবিটি পরিচালনা করেছেন অপূর্ব লাখিয়া। ছবিতে রয়েছেন মুকেশ ঋষি, অঙ্কুর ভাটিয়া-সহ আরও অনেকে। একাধিক বার মুক্তির দিন পিছিয়েছে ছবিটির। শেষ পর্যন্ত ৪ ডিসেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির কথা ঘোষণা করেছেন সলমন।
মুক্তি পিছিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে ভিএফএক্সের কাজ এবং চিত্রাঙ্গদার চোটের কথা জানিয়েছেন অভিনেতা। তাঁর দাবি, ছবির দৃশ্যগত মান নিয়ে কোনও আপস করতে চাননি নির্মাতারা। সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্রও কোনও কাটছাঁট ছাড়াই মিলেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে ছবির বিষয়বস্তু নিয়ে বিতর্কের রেশ কাটেনি। এক দিকে সরকারি সূত্রের দাবি, ভারত-চিন সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে ছবির উপস্থাপনায় বড় পরিবর্তন হয়েছে। অন্য দিকে, সলমনের বক্তব্য, ছবিটি কোনও দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং যুদ্ধের মানবিক মূল্য তুলে ধরার চেষ্টা। ফলে গালওয়ানের মতো স্পর্শকাতর সামরিক সংঘর্ষকে বড় পর্দায় কী ভাবে দেখানো হয়েছে, তা নিয়ে দর্শকের কৌতূহল এখন তুঙ্গে। ডিসেম্বরের মুক্তির পরই স্পষ্ট হবে, বিতর্কের বাইরে গিয়ে ছবিটি কতটা বিশ্বাসযোগ্য ভাবে ইতিহাস ও যুদ্ধের মানবিক দিক তুলে ধরতে পারে।




