বিশেষ প্রতিবেদন: হাতের মুঠোয় কতটা জোর রয়েছে, তা কি বলে দিতে পারে শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্য কেমন? শুনতে অবাক লাগলেও, চিকিৎসা ও শারীরবিজ্ঞানের গবেষণায় হাতের মুঠোর শক্তি বা ‘গ্রিপ স্ট্রেংথ’কে স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুধু পেশির জোর নয়, হৃদ্রোগের ঝুঁকি, মৃত্যুর আশঙ্কা, এমনকি বয়স বাড়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিতও দিতে পারে এই সাধারণ পরীক্ষা। ফলে শরীরের অবস্থা বুঝতে জটিল পরীক্ষার পাশাপাশি ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে হাতের মুঠোর শক্তি মাপার পদ্ধতি।
গ্রিপ স্ট্রেংথ বলতে হাত ও কবজির পেশি ব্যবহার করে কোনও বস্তু কতটা জোরে আঁকড়ে ধরা বা চেপে রাখার ক্ষমতাকে বোঝায়। জিমে হাতের ব্যায়াম, হ্যান্ড গ্রিপার চেপে ধরা কিংবা দু’হাতে ভারী জিনিস বহনের সময় এই শক্তির ব্যবহার হয়। সম্প্রতি ‘ডেড হ্যাং’ এবং ‘ফার্মার্স ক্যারি’-র মতো ব্যায়ামের জনপ্রিয়তা বাড়ায় গ্রিপ স্ট্রেংথ নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
মুঠোর শক্তি কমলে বাড়তে পারে মৃত্যুঝুঁকি?
গ্রিপ স্ট্রেংথ নিয়ে আলোচনার বড় সূত্র 2015 সালের একটি গবেষণা। ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত ওই গবেষণায় 17টি দেশের 1,39,691 জন মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। গড়ে চার বছর ধরে তাঁদের পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা। তাতে দেখা যায়, গ্রিপ স্ট্রেংথ প্রতি 5 কেজি কমলে যে কোনও কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় 16 শতাংশ বেড়ে যায়। হৃদ্রোগজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ার হার ছিল প্রায় 17 শতাংশ।
গবেষণাটির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, মৃত্যুঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে গ্রিপ স্ট্রেংথ সিস্টোলিক রক্তচাপের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে ভাল পূর্বাভাস দিতে পেরেছিল। সেই থেকেই হাতের মুঠোর শক্তিকে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের একটি সম্ভাব্য সূচক হিসেবে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন গবেষকেরা।
তবে এর অর্থ এই নয় যে শুধু হাতের ব্যায়াম করলেই আয়ু বাড়বে। গ্রিপ স্ট্রেংথ আসলে শরীরের সামগ্রিক পেশিশক্তি ও স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্ষমতার একটি পরোক্ষ মাপকাঠি। হাতের মুঠো দুর্বল হওয়ার পিছনে পেশির দুর্বলতা, স্নায়ুর সমস্যা, অপুষ্টি কিংবা বয়সজনিত শারীরিক পরিবর্তন থাকতে পারে।
মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার সঙ্গেও যোগ
গ্রিপ স্ট্রেংথের সঙ্গে মস্তিষ্কের সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা হচ্ছে। হাতের মুঠো শক্ত করে বন্ধ করতে শরীরের প্রায় 39টি পেশির মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। মস্তিষ্ক থেকে স্নায়ুর মাধ্যমে বৈদ্যুতিক সংকেত পেশিতে পৌঁছয়। সেই সংকেতের সাহায্যেই হাত ও কবজির পেশি একসঙ্গে কাজ করে। এই জটিল সমন্বয়ের কোনও অংশে সমস্যা দেখা দিলে মুঠোর শক্তিও কমতে পারে।
2024 সালে ‘এজিং অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল এক্সপেরিমেন্টাল রিসার্চ’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি ছোট গবেষণায় বয়স্কদের মধ্যে গ্রিপ স্ট্রেংথ ও চিন্তাশক্তির পরীক্ষার ফলের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়েছিল।
তাতে দেখা যায়, যাঁদের জ্ঞানীয় ক্ষমতার পরীক্ষায় ফল তুলনামূলক কম, তাঁদের ক্ষেত্রে আঙুল ও হাতের পেশির সমন্বিত শক্তি তৈরির ক্ষমতাও বেশি কমেছে। ব্রাসেলসের ভ্রিজে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইভান বাউটম্যানসের মতে, মুঠোর শক্তি ক্রমশ কমে যাওয়া কখনও কখনও জ্ঞানীয় ক্ষমতা হ্রাসের আগাম ইঙ্গিত হতে পারে। তাঁর সহ-লেখক হিসেবে যুক্ত একটি মেটা-অ্যানালিসিসে 60টি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণার প্রায় 3,80,000 মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণার ফল বলছে, গ্রিপ স্ট্রেংথের মতো সহজ পরীক্ষা ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যঝুঁকি চিহ্নিত করার প্রাথমিক উপায় হতে পারে।
তবে দুর্বল গ্রিপ স্ট্রেংথ মানেই কারও মস্তিষ্কের সমস্যা রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। এটি কোনও রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা নয়। বরং প্রয়োজন হলে আরও বিস্তারিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
কীভাবে মাপা হয় মুঠোর শক্তি?
গ্রিপ স্ট্রেংথ মাপার জন্য বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, যার নাম হ্যান্ড-গ্রিপ ডায়নামোমিটার। সাধারণত বসে হাতের কনুই প্রায় 90 ডিগ্রি বাঁকিয়ে কবজি স্বাভাবিক অবস্থায় রেখে যন্ত্রটি যতটা সম্ভব জোরে চেপে ধরতে হয়। দু’হাতেই একাধিক বার পরীক্ষা করে পাওয়া ফলের ভিত্তিতে শক্তি নির্ধারণ করা হয়। এই পরীক্ষা তুলনামূলক সহজ, দ্রুত এবং ব্যয়বহুল নয়।
তবে বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক গঠন এবং ব্যবহৃত যন্ত্রের উপর নির্ভর করে স্বাভাবিক গ্রিপ স্ট্রেংথের মান বদলাতে পারে। তাই একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাকে সবার ক্ষেত্রে একই ভাবে প্রয়োগ করা যায় না। শুধু হাত নয়, পায়ের পেশিও গুরুত্বপূর্ণ গবেষকদের সতর্কবার্তা, গ্রিপ স্ট্রেংথের সঙ্গে দীর্ঘায়ু ও বিভিন্ন রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক থাকলেও একে একমাত্র স্বাস্থ্যসূচক হিসেবে দেখা ঠিক নয়। হাতের মুঠোর শক্তি মূলত শরীরের সামগ্রিক পেশিশক্তির একটি প্রতিনিধিত্বমূলক মাপকাঠি।
কিন্তু শরীরের সব পেশির অবস্থা এটি দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। বিশেষ করে পায়ের পেশির শক্তি, হাঁটার গতি, বসা থেকে উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা এবং শরীরের ভারসাম্যও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বয়স বাড়ার সঙ্গে স্বাধীন ভাবে চলাফেরা এবং দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা বজায় রাখতে পায়ের পেশির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই শুধু হ্যান্ড গ্রিপার চেপে হাতের শক্তি বাড়ানোর বদলে গোটা শরীরের পেশির যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞেরা। নিয়মিত প্রতিরোধমূলক ব্যায়াম, হাঁটা, পায়ের পেশির অনুশীলন এবং পর্যাপ্ত পুষ্টি সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
সব মিলিয়ে, হাতের মুঠোর শক্তি শরীরের ভিতরের অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ আভাস দিতে পারে। কিন্তু শক্ত মুঠো মানেই নিখুঁত স্বাস্থ্য নয়, আবার দুর্বল মুঠো মানেই অসুস্থতা নয়। বরং শরীরের সামগ্রিক অবস্থা বোঝার জন্য এটি একটি সহজ সতর্কবার্তা—যা প্রয়োজনীয় সময়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার দিকে নজর ফেরাতে পারে।




