চোখের চিকিৎসার জন্য শেষ পর্যন্ত বিদেশযাত্রার ছাড় পেলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা হাইকোর্টের আপত্তি পেরিয়ে সোমবার সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে তিন সপ্তাহের জন্য বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দিল। তবে একাধিক শর্তও বেঁধে দিয়েছে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহানার বেঞ্চ। অভিষেককে কেবল কূটনৈতিক পাসপোর্টেই যাতায়াত করতে হবে। বিদেশে কোথায় থাকবেন, কোন চিকিৎসক বা হাসপাতালে চিকিৎসা করাবেন, কত দিন থাকবেন এবং বিমানের বিস্তারিত—সব তথ্য তদন্তকারী সংস্থাকে জানাতে হবে। সেই তথ্য গোপন রাখতে হবে, জনসমক্ষে প্রকাশ করা যাবে না।
মামলার সূত্রপাত ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারপর্বে অভিষেকের একটি কথিত ‘উস্কানিমূলক’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া ফৌজদারি মামলা থেকে। ওই মামলায় গ্রেফতারির উপর স্থগিতাদেশ দেওয়ার সময় বিদেশযাত্রার উপরেও বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল কলকাতা হাইকোর্ট। চোখের চিকিৎসার জন্য সেই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার আবেদন নিয়েই প্রথমে হাইকোর্টে যান অভিষেক। কিন্তু পরপর কয়েক দফা আইনি টানাপড়েনের পর বিষয়টি পৌঁছয় সুপ্রিম কোর্টে।
এর আগে গত ৫ অগস্ট অভিষেকের বিদেশে গিয়ে চিকিৎসার আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্ট। তার আগে শীর্ষ আদালত মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য হাই কোর্টে পাঠিয়েছিল। হাইকোর্টের নির্দেশ ছিল, এসএসকেএম হাসপাতালে একটি মেডিক্যাল বোর্ড অভিষেককে পরীক্ষা করে দেখবে—ভারতে তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সম্ভব কি না এবং বিদেশে চিকিৎসার সত্যিই প্রয়োজন রয়েছে কি না। কিন্তু অভিষেকের আইনজীবীরা জানিয়ে দেন, তিনি ওই মেডিক্যাল বোর্ডের সামনে হাজির হতে রাজি নন। এর পরেই আবেদন খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট।
হাইকোর্টে অভিষেকের আইনজীবীদের যুক্তি ছিল, তিনি আমেরিকায় যে চিকিৎসকের কাছে আগে চিকিৎসা করিয়েছেন, তাঁর কাছেই ফের চিকিৎসা করাতে চান। একই চিকিৎসক ও চিকিৎসক দলের সঙ্গে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ বলে আদালতে জানানো হয়েছিল। অভিষেকের দাবি ছিল, বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়টি তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসা-পছন্দের সঙ্গে যুক্ত। অন্য দিকে রাজ্যের যুক্তি ছিল, বিদেশে যাওয়ার আগে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা নিরপেক্ষ ভাবে যাচাই করা দরকার।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টে শুনানির শুরুতেই অভিষেকের বিদেশযাত্রার বিরোধিতা করেন রাজ্যের হয়ে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এস ভি রাজু। তাঁর বক্তব্য, অভিষেকের বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা রয়েছে এবং বিদেশে যাওয়ার অনুমতি পেলে তিনি দেশে ফিরে নাও আসতে পারেন। চিকিৎসার প্রয়োজন নিয়ে আপত্তি না থাকলেও, বিদেশে যাওয়ার আগে সেই প্রয়োজনের যথার্থতা যাচাই করা উচিত বলেও সওয়াল করেন তিনি।
অভিষেকের হয়ে পাল্টা সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন। তিনি জানান, অভিষেকের কাছে বর্তমানে কূটনৈতিক পাসপোর্টই রয়েছে। ওই পাসপোর্টে বিদেশযাত্রা হলে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলির মাধ্যমে তাঁর গতিবিধি নজরে রাখা সম্ভব। ফলে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবেন—এই আশঙ্কার কোনও ভিত্তি নেই বলেই আদালতে দাবি করেন তিনি। অভিষেক একজন সাংসদ, একটি জাতীয় দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এবং তাঁর পরিবারও দেশে রয়েছে—এই বিষয়গুলিও আদালতের সামনে তুলে ধরা হয়।
এর পরেই রাজ্যের আপত্তি নিয়ে বিশেষ ভাবে প্রশ্ন তোলে বেঞ্চ। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, প্রত্যেক ব্যক্তির বিদেশ যাওয়ার অধিকার রয়েছে, নিজের পছন্দের চিকিৎসা বেছে নেওয়ার অধিকারও রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, যে মামলাকে কেন্দ্র করে বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল, সেটির মূল বিষয় একটি নির্বাচনী ভাষণ।
শেষ পর্যন্ত তিন সপ্তাহের জন্য বিদেশযাত্রায় অনুমতি দেয় শীর্ষ আদালত। জানা গিয়েছে, সফরটি সেপ্টেম্বরে হওয়ার কথা। আদালতের শর্ত অনুযায়ী, অভিষেককে তাঁর কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করতে হবে। বিদেশে তাঁর থাকার ঠিকানা, চিকিৎসক ও হাসপাতালের নাম, চিকিৎসার সময়সীমা এবং বিমানের তথ্য-সহ সম্পূর্ণ সফরসূচি তদন্তকারী সংস্থাকে দিতে হবে। তবে সেই তথ্য তদন্তের প্রয়োজনে ব্যবহার করা গেলেও তা প্রকাশ্যে আনা যাবে না।
অর্থাৎ, চিকিৎসার প্রশ্নে অভিষেককে বিদেশ যাওয়ার দরজা খুলে দিল শীর্ষ আদালত, কিন্তু তদন্তের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণও বজায় রাখল। কয়েক দিনের আইনি টানাপড়েনের পর সোমবারের এই রায়ে আপাতত বিদেশে চোখের চিকিৎসার ক্ষেত্রে অভিষেকের বাধা কাটল।