নয়াদিল্লি: দিল্লির যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি পুলিশের কাছে জবাব চাইল সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া মামলার শুনানিতে শীর্ষ আদালত জানতে চেয়েছে, আদালতের আগের নির্দেশ বা মৌখিক পর্যবেক্ষণকে ভিত্তি করেই কি যন্তর মন্তরকে প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, নাকি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্বাধীন ভাবে বিষয়টি পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন্দ্রের তরফে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বিকল্প প্রতিবাদস্থল চিহ্নিত করার জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের গঠিত একটি কমিটির সুপারিশ মেনেই পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ এই মামলায় কেন্দ্রের বক্তব্য জানতে চেয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, যন্তর মন্তরের মতো দীর্ঘদিনের প্রতিবাদস্থলকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের পিছনে কী যুক্তি রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আবেদনকারীর বক্তব্য, প্রতিবাদের জায়গা বদল করা শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এর সঙ্গে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ ভাবে জমায়েত হওয়ার মৌলিক অধিকারের প্রশ্নও জড়িত। দিল্লি পুলিশের কমিশনার অনুরাগ কুমার ১১ অক্টোবর একটি নির্দেশ জারি করে যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেন। পরে সংশোধিত নির্দেশে রাজধানীতে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের জন্য তিনটি বিকল্প জায়গা নির্দিষ্ট করা হয়—রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি গ্রাউন্ড। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে গঠিত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশের নির্দেশে জানানো হয়। কিন্তু সিদ্ধান্তটির সময় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আবহে যন্তর মন্তরকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সামনে আসে। এর আগে ৯ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো-সহ বিকল্প জায়গা চিহ্নিত করার কথা বলেছিল। সেই পর্যবেক্ষণকে কী ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তা নিয়েই এখন আইনি বিতর্ক। দিল্লি পুলিশ ১৩ অক্টোবর দিল্লি হাই কোর্টে জানিয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের ৯ অক্টোবরের নির্দেশের পরেই যন্তর মন্তরকে প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রের তরফে তুষার মেহতা দাবি করেন, ওই নির্দেশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তাঁর বক্তব্য, বিকল্প প্রতিবাদস্থল খুঁজে বার করার জন্য আগে থেকেই একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং সেই কমিটি বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিয়েছিল। ফলে কেন্দ্র ও পুলিশের বক্তব্যের মধ্যে যে ফারাক সামনে এসেছে, তা মামলার গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।
আবেদনকারী স্বাতী সিংহের তরফে আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছেন, যন্তর মন্তরকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিবাদের স্থান এমন হওয়া প্রয়োজন, যেখান থেকে আন্দোলনকারীরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁদের বক্তব্য পৌঁছে দিতে পারেন। বিকল্প জায়গা নির্ধারণের নামে এমন কোনও ব্যবস্থা করা যায় না, যাতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে—আবেদনে এই যুক্তিও তুলে ধরা হয়েছে। আবেদনকারীর বক্তব্য, যন্তর মন্তর দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং বিভিন্ন আন্দোলনকারীর প্রতিবাদের পরিচিত জায়গা। সেখানে প্রতিবাদ করার সুযোগ বন্ধ করে দিলে বিকল্প স্থানগুলি কতটা কার্যকর হবে, তা বিবেচনা করা জরুরি। বিকল্প জায়গাগুলির অবস্থান, যাতায়াতের সুবিধা, সাধারণ মানুষের নজরে আসার সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো—সব দিক খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
এই বিতর্কে ২০১৮ সালের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ‘মজদুর কিষাণ শক্তি সংগঠন বনাম ভারত সরকার’ মামলায় আদালত যন্তর মন্তর ও বোট ক্লাব এলাকায় বিক্ষোভের উপর বিধিনিষেধের বিষয়টি বিবেচনা করেছিল। সেই রায়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার এবং জনজীবন, যান চলাচল ও নিরাপত্তার প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রাখার কথা বলা হয়েছিল। বর্তমান আবেদনকারীদের বক্তব্য, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের নামে প্রতিবাদের মৌলিক অধিকার খর্ব করা যায় না। যন্তর মন্তরকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টেও মামলা হয়েছে। ভারতীয় যুব কংগ্রেসের সভাপতি উদয় ভানু চিবের তরফে দায়ের করা আবেদনে প্রতিবাদের অনুমতি প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, যন্তর মন্তর আর নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল না থাকায় ওই আবেদনটির প্রাসঙ্গিকতা নেই। কিন্তু আবেদনকারীর আইনজীবীরা এই যুক্তি মানতে চাননি। তাঁদের বক্তব্য, প্রতিবাদস্থল হিসেবে যন্তর মন্তরের স্বীকৃতি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকেই যখন চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে, তখন মামলাটি নিষ্পত্তি না করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। দিল্লি হাই কোর্টে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে ১৭ নভেম্বর।
এদিকে, দিল্লিতে সাম্প্রতিক প্রতিবাদ কর্মসূচিকে ঘিরে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও সুপ্রিম কোর্টে অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনকারীদের উপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আদালত বিক্ষোভের সময়কার সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। বেসরকারি ব্যক্তিদের কাছেও কোনও ছবি বা ভিডিয়ো থাকলে তা সংরক্ষণ করার কথা বলা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে সেগুলি আদালতে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা যায়।
যন্তর মন্তরকে প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের ফলে রাজধানীতে বিক্ষোভের স্থান ও পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এক দিকে যান চলাচল, জননিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর যুক্তি তুলে ধরছে প্রশাসন, অন্য দিকে আন্দোলনকারীরা বলছেন, প্রতিবাদের অধিকার কার্যকর রাখতে উপযুক্ত ও সহজে পৌঁছনো যায় এমন জায়গা থাকা জরুরি। কেন্দ্র ও দিল্লি পুলিশের জবাব পাওয়ার পর এই বিতর্কে আদালত কী অবস্থান নেয়, এখন সেদিকেই নজর।





