গ্লাসগোতে চলছে কমনওয়েলথ গেমস। তার মাঝেই অবসর ঘোষণা করলেন ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সের অন্যতম উজ্জ্বল মুখ স্বপ্না বর্মন। ২৯ বছর বয়সি এই হেপ্টাথলিট শুক্রবার সমাজ মাধ্যমে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের চোট-আঘাতের কারণেই এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। ২০১৮ সালের জাকার্তা এশিয়ান গেমসে হেপ্টাথলনে সোনা জিতে প্রথম ভারতীয় হিসেবে নজির গড়েছিলেন স্বপ্না। তিনি বলেন, “বহু বছর ধরে স্লিপ ডিস্ক, হাঁটুর চোট-সহ একাধিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করেছি। ব্যথা নিয়েই খেলে গিয়েছি। কিন্তু এখন শরীর আর আগের মতো সঙ্গ দিচ্ছে না। অ্যাথলেটিক্স শুধু আমার খেলা নয়। এটাই ছিল আমার পরিচয়, আমার স্বপ্ন।”
১৯৯৬ সালের ২৯ অক্টোবর উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ির ঘোষপাড়া গ্রামে জন্ম স্বপ্নার। চরম আর্থিক অনটনের মধ্যেই বড় হয়ে ওঠা এই ক্রীড়াবিদের বাবা পঞ্চানন বর্মন ছিলেন রিকশাচালক। যিনি পরে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। অন্যদিকে মা কাজ করতেন একটি চা-বাগানে। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যেই অ্যাথলেটিক্সকে বেছে নিয়েছিলেন স্বপ্না। কলকাতার স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়ার (SAI) কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময়ও তাঁকে লড়তে হয়েছে বিরল শারীরিক সমস্যার সঙ্গে। জন্মগতভাবে দুই পায়েই ছয়টি করে আঙুল থাকায় প্রতিযোগিতার সময় তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করতে হতো তাঁকে।
২০১৭ সালে ভুবনেশ্বরে এশিয়ান অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে হেপ্টাথলনে সোনা জিতে প্রথম বড় সাফল্য পান স্বপ্না। শেষ ইভেন্ট ৮০০ মিটার দৌড়ের পর তিনি ট্র্যাকে লুটিয়ে পড়লেও আগের ইভেন্টগুলিতে সংগ্রহ করা পয়েন্টের জোরে শিরোপা নিশ্চিত করেন। তবে তাঁর কেরিয়ারের সেরা মুহূর্ত আসে ২০১৮ সালের জাকার্তা এশিয়ান গেমসে। চোয়ালে চোট নিয়েই ৬০২৬ পয়েন্ট সংগ্রহ করে ইতিহাস গড়েন তিনি। সেই সাফল্যের পর ২০১৯ সালে অর্জুন পুরস্কারে ভূষিত হন স্বপ্না। যদিও তাঁর এই স্কোর জে. জে. শোভার ৬২১১ পয়েন্টের ন্যাশনাল রেকর্ড ছুঁতে পারেনি।
তবে এর পর থেকেই একের পর এক চোট বাধা হয়ে দাঁড়ায় স্বপ্নার কেরিয়ারে। তবু ২০১৯ ও ২০২৩ সালের এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে রুপো এবং ২০২৩ সালের এশিয়ান ইনডোর চ্যাম্পিয়নশিপে পেন্টাথলনে রুপো জেতেন তিনি। হাংঝৌ এশিয়ান গেমসে মাত্র চার পয়েন্টের জন্য ব্রোঞ্জ হাতছাড়া করে চতুর্থ স্থানে শেষ করেছিলেন স্বপ্না। ২০২৫ সালের জাতীয় ওপেন অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপেই ছিল তাঁর শেষ প্রতিযোগিতা। যেখানে তৃতীয় হন তিনি।
গত বিধানসভা ভোটের আগে রেলের চাকরি ছেড়ে রাজনীতির মঞ্চেও পা রেখেছিলেন স্বপ্না। কিন্তু তৃণমূলের টিকিটে হেরে যান তিনি। এর পর রাজনীতিকেই বিদায় জানান তিনি। আর এ বার ছাড়লেন নিজের প্রিয় ট্র্যাক। অবসরের ঘোষণা করতে গিয়ে আবেগতাড়িত স্বপ্না বলেন, “যা সারাজীবন ভালোবেসেছি, তাকে বিদায় জানানো সহজ নয়। মন চায় এখনও প্রতিযোগিতায় নামতে। কিন্তু এটা মেনে নিতেই হবে যে, জীবনের এই অধ্যায় শেষ হয়ে গিয়েছে।”