তেহট্ট: দিনের বেলা তাঁর হাতে থাকে ট্রাকের স্টিয়ারিং। রাস্তার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সংসার চালান। কিন্তু রাত নামলেই কখনও কখনও অন্য রকম ডাক আসে—বাড়িতে ঢুকে পড়েছে বিষধর সাপ! খবর পেলেই আর বসে থাকতে পারেন না 61 বছরের নেপাল ঘোষ। পরিবারের আপত্তি, আত্মীয়দের বকুনি, এমনকি প্রাণের ঝুঁকিও তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি। খবর পেলেই বেরিয়ে পড়েন। সাপটিকে ধরে নিরাপদ জায়গায় ছেড়ে দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বেতাই ছানাতলাপাড়ার বাসিন্দা নেপাল এখন তাই অনেকের কাছেই ‘সাপের বন্ধু’।
ছোটবেলা থেকেই সাপ ধরার প্রতি তাঁর অদ্ভুত টান। বয়স বাড়লেও সেই নেশা কমেনি। পেশায় দক্ষ ট্রাকচালক নেপাল বিভিন্ন ধরনের যান চালানোর পাশাপাশি লোকালয়ে ঢুকে পড়া সাপ উদ্ধারের কাজেও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে বর্ষাকালে বাড়ে তাঁর ডাক। কোথাও সাপ দেখা গিয়েছে—এই খবর কানে গেলেই নিজের কাজের ফাঁকে সেখানে পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
সম্প্রতি ছানাতলাপাড়ার একটি বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল একটি বিষধর সাপ। খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছে সেটিকে উদ্ধার করেন নেপাল। পরে লোকালয় থেকে দূরে নিরাপদ জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয় সাপটিকে। তাঁর কাছে ঘটনাটি নিছক সাপ ধরা নয়। যে প্রাণীটিকে ভয় পেয়ে অনেকেই মেরে ফেলতে চান, সেটিকে বাঁচিয়ে তার স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়াই তাঁর কাছে বড় কথা।
নেপালের দাবি, সাপ ধরে বিক্রি করলে অর্থ উপার্জনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই পথে হাঁটতে চান না তিনি। তাঁর বক্তব্য, ‘‘অনেক দিন ধরেই শখের বসে সাপ ধরি। খবর পেলেই বাড়ি বা লোকালয় থেকে সাপ ধরে দূরে জঙ্গলে ছেড়ে দিই।’’
এই শখ অবশ্য পরিবারের কাছে মোটেই স্বস্তির নয়। বিষধর সাপ ধরতে গিয়ে যে কোনও মুহূর্তে বিপদ ঘটতে পারে—এই আশঙ্কাতেই তাঁর পরিবারের সদস্যরা বার বার তাঁকে সতর্ক করেন। কখনও কখনও পরিবারের কাউকে না জানিয়েই সাপ ধরতে বেরিয়ে পড়েন নেপাল। বাড়ি ফিরে শুনতে হয় বকুনিও। কিন্তু দীর্ঘ দিনের এই অভ্যাস এখনও ছাড়তে পারেননি তিনি।
তাঁর কাজের প্রশংসা করেছেন এলাকার চিকিৎসক সাত্তার বিশ্বাস। তাঁর মতে, এই বয়সে বিষধর সাপ ধরার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ নিঃসন্দেহে সাহসের। কিন্তু একই সঙ্গে বিপদের সম্ভাবনাও যথেষ্ট। সামান্য ভুলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বন দফতরের কর্মীরা সাধারণত প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ব্যবহার করে সাপ উদ্ধার করেন। সেখানে নেপাল অনেক সময় প্রায় খালি হাতেই এই কাজ করেন বলে তাঁর উদ্বেগ।
বন দফতরের তরফেও নেপালের কাজের প্রশংসা করা হয়েছে। তেহট্ট বন দফতরের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, প্রশিক্ষণ না থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ দিন ধরে নেপাল যেভাবে লোকালয় থেকে সাপ উদ্ধার করে নিরাপদ জায়গায় ছেড়ে দিচ্ছেন, তা প্রশংসনীয়। অনেক ক্ষেত্রে বন দফতরে খবর পৌঁছনোর পর ঘটনাস্থলে পৌঁছতে কিছুটা সময় লাগে। সেই জায়গায় স্থানীয় ভাবে দ্রুত সাপ উদ্ধার হওয়ায় মানুষ এবং সাপ—দুই পক্ষেরই ঝুঁকি কমতে পারে।
তবে বন দফতরের বক্তব্য, প্রশংসার পাশাপাশি নিরাপত্তাও জরুরি। নেপালের সঙ্গে দেখা করে সাপ উদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রাথমিক কিছু ধারণা এবং সতর্কতার বিষয়গুলি জানানো হবে। তাতে এক দিকে সাপ উদ্ধারের কাজ আরও নিরাপদ হবে, অন্য দিকে নেপালের নিজের প্রাণের ঝুঁকিও কমবে।
আসলে লোকালয়ে সাপ ঢুকলেই তাকে মেরে ফেলার বদলে উদ্ধার করে নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। সাপকে ঘিরে ভয় ও ভুল ধারণার কারণে অনেক জায়গায় তাদের মেরে ফেলার ঘটনা ঘটে। অথচ গবেষণাতেও দেখা গিয়েছে, সাপ সম্পর্কে মানুষের ভয় ও ভুল ধারণা তাদের নির্বিচারে হত্যার প্রবণতা বাড়াতে পারে।
তেহট্টের নেপাল ঘোষ অবশ্য এসব বড় কথা জানেন না। তাঁর কাছে বিষয়টি অনেক সহজ—বাড়িতে ঢুকে পড়েছে সাপ, খবর এসেছে, তাই সেটিকে বাঁচিয়ে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দিতে হবে। সংসার চালাতে দিনের আলোয় ট্রাকের স্টিয়ারিং সামলান। আর কখনও রাতবিরেতে, নিঃশব্দে, ভয়কে সঙ্গী করেই খুঁজে বেড়ান সেই প্রাণীটিকে। তাই স্থানীয়দের কাছে তিনি শুধু ট্রাকচালক নন, ‘সাপের বন্ধু’ নেপাল।