নয়াদিল্লি: রাবণ, কুম্ভকর্ণ, মেঘনাদের সঙ্গে এ বার দশেরার আগুনে পুড়বে ৩০ ফুটের দৈত্যাকার আরশোলা! দিল্লির পিতমপুরার রামলীলায় এমনই অভিনব আয়োজন করেছে শ্রী কেশব রামলীলা কমিটি। আয়োজকদের দাবি, ঘরবাড়ি, পাড়া এবং সমাজ থেকে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দূর করার বার্তা দিতেই এই উদ্যোগ। স্বচ্ছ ভারত ও স্বচ্ছ দিল্লি অভিযানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই আরশোলাকে অশুভের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কমিটি। তবে রাজধানীতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র আন্দোলন ঘিরে যখন রাজনৈতিক উত্তাপ তুঙ্গে, তখন এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে প্রশ্নও উঠছে।
কমিটির সভাপতি তথা দিল্লির মডেল টাউন কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক অশোক গোয়েল দেওরাহার বক্তব্য, এই উদ্যোগের সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই। তাঁর দাবি, দশেরা শুধু রাবণবধের উৎসব নয়, সত্যের জয় এবং অন্যায়ের পরাজয়ের প্রতীকও। অতীতেও দেশের বিভিন্ন সমস্যাকে তুলে ধরতে রামলীলার মঞ্চে নানা প্রতীকী কুশপুতুল পোড়ানো হয়েছে। এ বার সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরশোলা, যা নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের প্রতীক বলে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। পিতমপুরায় কমিটির নিজস্ব প্রাঙ্গণেই পোড়ানো হবে ওই ৩০ ফুটের কুশপুতুল। শুধু রাবণ, কুম্ভকর্ণ ও মেঘনাদের পাশে আরশোলার কুশপুতুল দাঁড় করানোই নয়, রাবণের অসুরসেনার মধ্যেও আরশোলার প্রতীকী উপস্থিতি থাকবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা। তাঁদের বক্তব্য, দশেরার ঐতিহ্যকে কাজে লাগিয়ে পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোই লক্ষ্য।
কিন্তু আরশোলাকে বেছে নেওয়ার সময় নিয়েই তৈরি হয়েছে কৌতূহল। দিল্লিতে গত কয়েক মাস ধরে সক্রিয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। এই গোষ্ঠীর আন্দোলনের সূত্রপাত প্রাক্তন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ঘিরে প্রতিবাদ থেকে। পরে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী দল ও ছাত্র সংগঠনগুলির সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেয় তারা। জুন ও জুলাই মাসে দিল্লির যন্তর মন্তরে দীর্ঘদিন অবস্থান বিক্ষোভ চালিয়েছিল সিজেপি। পরে সংসদ ভবনের দিকে মিছিলও করে তারা। সেই আন্দোলনের সময় একাধিক কর্মসূচি ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর তৈরি হয়। প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঘটনাও আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে যায়। যদিও পদত্যাগের কারণ ও আন্দোলনের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে অভিযোগের প্রেক্ষিতে ফের পথে নেমেছে সিজেপি। বিরোধী দল ও ছাত্র সংগঠনগুলির সঙ্গে তাদের দাবি, ভোটার তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ করুন।
সিজেপি-র নামের পিছনেও রয়েছে একটি বিতর্ক। মে মাসে সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের মন্তব্যে ‘আরশোলা’ শব্দটি উঠে এসেছিল। অভিযোগ ছিল, ভুয়ো ডিগ্রিধারী কিছু ব্যক্তি সমাজমাধ্যম ও তথ্যের অধিকার আইনের কর্মী হিসেবে পরিচিত হয়ে ব্যবস্থাকে আক্রমণ করছেন। ওই মন্তব্যের পর তরুণদের একাংশের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। সেই বিতর্ক থেকেই ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদী পরিচয় হিসেবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামটি সামনে আসে। পরে প্রধান বিচারপতি দাবি করেন, তাঁর মৌখিক মন্তব্যকে ভুল ভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং অসৎ উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করে তরুণদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তত দিনে ‘আরশোলা’ শব্দটি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সিজেপি-র আন্দোলনে শব্দটি প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে রামলীলায় আরশোলার কুশপুতুল পোড়ানোর সিদ্ধান্ত স্বাভাবিক ভাবেই নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও কমিটির সভাপতি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এর পিছনে কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। তাঁর বক্তব্য, নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ানোই একমাত্র লক্ষ্য। তবে রাজধানীর বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই প্রতীকী আয়োজনকে কী ভাবে দেখা হবে, তা নিয়ে বিতর্ক থামার সম্ভাবনা কম। আয়োজকেরা পরিচ্ছন্নতার বার্তা দেওয়ার কথা বলছেন, অন্য দিকে আরশোলা শব্দটিকে ঘিরে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এই উদ্যোগকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। দশেরার মঞ্চে এ বার তাই রাবণবধের পাশাপাশি নজর থাকবে সেই ৩০ ফুটের আরশোলার দিকেও।





