ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক দরপতন, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ট্রেডিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থ আটকে পড়ার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC)-এর কিছু সিদ্ধান্ত ও কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাজারসংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি। তাঁদের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কমিশনের Executive Director (General) মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়নি এবং তাঁর বক্তব্যও প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে। বাজারে একদিকে ধারাবাহিক দরপতন, অন্যদিকে কয়েকটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ট্রেডিং কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। বিশেষ করে যেসব বিনিয়োগকারী মার্জিন ঋণ নিয়ে শেয়ার কিনেছেন, তাঁদের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতির অন্যতম উদাহরণ হিসেবে সামনে আনা হয়েছে AVIVA Equity Management Limited-এর বিষয়টি। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি ২ জুলাই ২০২৬ তারিখে স্টক ব্রোকার ও স্টক ডিলার সনদ নবায়নের জন্য আবেদন করেছিল। পরবর্তী সময়ে ১৬ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির ট্রেডিং কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৫ হাজার বিনিয়োগকারী সরাসরি সমস্যায় পড়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, ট্রেডিং বন্ধ থাকার কারণে বিনিয়োগকারীরা নিজেদের শেয়ার স্বাভাবিকভাবে লেনদেন করতে পারছেন না। একই সঙ্গে অন্য কোনো ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানে শেয়ার স্থানান্তর, মার্জিন ঋণ সমন্বয় কিংবা প্রয়োজনের সময়ে বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। বাজারে যদি শেয়ারের দাম কমতে থাকে, তাহলে মার্জিন ঋণে বিনিয়োগ করা ব্যক্তিদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই পরিস্থিতিতে সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
AVIVA Equity Management Limited-এর নাম BSEC-এর সরকারি ওয়েবসাইটের সংশ্লিষ্ট তালিকায় রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রক অবস্থান এবং পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবি আরও জোরালো হয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, একটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ট্রেডিং কার্যক্রম বন্ধ করার আগে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ, গ্রাহকের সম্পদ, CCA surplus, stock reconciliation এবং অন্যান্য কমপ্লায়েন্স বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটির ট্রেডিং কার্যক্রম পুনরায় চালুর বিষয়ে এখনও অগ্রগতি হয়নি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নির্দেশনাটি যাচাই করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এরপরও কেন প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম স্বাভাবিক করা হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি দীর্ঘায়িত হওয়ায় প্রায় ৫ হাজার বিনিয়োগকারী আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো BSEC-এর কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলামের ভূমিকা। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, লাইসেন্স নবায়ন এবং বাজারসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং জরিমানার ভয় দেখানোর অভিযোগও তোলা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে আর্থিক সুবিধা চাওয়ার দাবি। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, কিছু ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে সমস্যার সমাধানের বিনিময়ে অর্থ দাবি করা হয়েছে। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সরকারি ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করার জন্য অর্থের প্রয়োজন হয় বলে কথিতভাবে দাবি করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি, অডিও-ভিডিও প্রমাণ বা স্বাধীন সাক্ষ্য প্রতিবেদনের হাতে নেই। ফলে অভিযোগটি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
আনোয়ারুল ইসলামের অতীত ভূমিকা নিয়েও অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের দাবি, তিনি সাবেক BSEC চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম এবং সাবেক কমিশনার তারিকুজ্জামানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাঁর ভূমিকা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, সাবেক কমিশনার তারিকুজ্জামানের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে টুঙ্গিপাড়ায় শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি এবং ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা নিবেদনের অনুষ্ঠানে আনোয়ারুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। এই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত ছবি বা প্রতিবেদন থাকার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোনো সরকারি কর্মকর্তা কোনো রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় স্মরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন—এ তথ্য একা তাঁর রাজনৈতিক আনুগত্য, বেআইনি কর্মকাণ্ড বা কোনো অপরাধ প্রমাণ করে না। এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক বিধি, অনুষ্ঠানের প্রকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, সাবেক BSEC চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদের সময় ২৩ জন কর্মকর্তার চাকরিচ্যুতির ঘটনাও অভিযোগে সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতির পেছনে আনোয়ারুল ইসলামের ভূমিকা ছিল। তাঁদের আরও দাবি, চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বর্তমানে আইনি লড়াই করছেন এবং চাকরি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে চাকরিচ্যুতির সরকারি কারণ, আদালতের নথি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ না করে এ বিষয়ে কারও ব্যক্তিগত দায় নিশ্চিত করা যায় না।
পুঁজিবাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়েও অভিযোগকারীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের দাবি, বাজার যখন ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার চেষ্টা করে, তখন বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তের কারণে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। আবার বাজারে দরপতন হলে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি আরও বাড়ছে। তাঁদের প্রশ্ন, নিয়ন্ত্রকের উদ্দেশ্য যদি বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দেওয়া হয়, তাহলে ট্রেডিং বন্ধের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ওপর তার প্রভাব কতটা বিবেচনা করা হচ্ছে?
বিশেষ করে প্রায় ৫ হাজার বিনিয়োগকারীর স্বার্থের বিষয়টি সামনে এনে দ্রুত সমাধানের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, বিভিন্ন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১ লাখ বিনিয়োগকারীর স্বার্থ রক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মের ধারাবাহিক প্রয়োগ, সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং অভিযোগের দ্রুত তদন্ত। কোনো ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বা ট্রেডিং কার্যক্রম স্থগিত করা হলে তার কারণ, সংশ্লিষ্ট বিধান এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ার সুরক্ষার ব্যবস্থা স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন। একইভাবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করাও জরুরি।
এদিকে অভিযোগকারীরা সরকারের কাছে সরাসরি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, দ্রুত তদন্ত করে AVIVA Equity Management Limited-সহ যেসব ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
পুঁজিবাজারে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় জড়িত। ফলে একটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হওয়া কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো সিদ্ধান্ত শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব ফেলে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে হাজার হাজার বিনিয়োগকারীর সঞ্চয়, ঋণ, শেয়ার এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক পরিকল্পনা। তাই AVIVA Equity Management Limited-এর ঘটনাসহ উত্থাপিত অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্তের দাবি এখন আরও জোরালো হচ্ছে।
এখন মূল প্রশ্ন, AVIVA Equity Management Limited-এর ট্রেডিং কার্যক্রম কেন বন্ধ করা হয়েছিল, লাইসেন্স নবায়নের আবেদনের বর্তমান অবস্থা কী, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা বাস্তবায়নে অগ্রগতি কোথায় এবং BSEC-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ভিত্তি কতটা সত্য? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে সংশ্লিষ্ট নথি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যাখ্যা এবং স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে। পুঁজিবাজারের হাজারো বিনিয়োগকারীর স্বার্থে এখন সেই স্বচ্ছতার দিকেই তাকিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল।
