একসময় চিঠিতে মনের কথা বোঝাতে লিখতে হত—‘ভালো থেকো’, ‘অনেক ভালোবাসা’, কিংবা ‘রাগ করো না’। এখন সেই জায়গা দখল করেছে একটি ❤️, 😊 কিংবা 😂। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একটি ছোট্ট প্রতীক প্রকাশ করে ফেলছে আনন্দ, দুঃখ, বিস্ময়, রাগ, ভালোবাসা বা ব্যঙ্গ। ডিজিটাল যুগে শব্দের পাশাপাশি ইমোজি এখন কার্যত নতুন এক ভাষা।
প্রতি বছর ১৭ জুলাই পালিত হয় বিশ্ব ইমোজি দিবস (World Emoji Day)। ২০১৪ সালে ইমোজিপিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা জেরেমি বার্জ এই দিনটির সূচনা করেন। ১৭ জুলাই তারিখটি বেছে নেওয়ার কারণও বেশ অভিনব। স্মার্টফোনের ক্যালেন্ডার ইমোজিতে দীর্ঘদিন ধরেই এই তারিখটি দেখা যায়। সেই থেকেই দিনটি বিশ্বজুড়ে ইমোজির উদ্যাপনের দিন হিসেবে পরিচিতি পায়।
জাপানে জন্ম, বিশ্বজুড়ে বিপ্লব
আজ যে ইমোজি ছাড়া হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা এক্স (আগের টুইটার)-এ কথোপকথন প্রায় অসম্পূর্ণ মনে হয়, তার জন্ম কিন্তু জাপানে। ১৯৯৯ সালে জাপানি ডিজাইনার শিগেতাকা কুরিতা মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবার জন্য প্রথম ইমোজির নকশা তৈরি করেন। প্রথম দিকে মাত্র ১৭৬টি ইমোজি ছিল। এখন ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের অনুমোদিত ইমোজির সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছেছে এবং প্রতি বছরই নতুন নতুন ইমোজি যুক্ত হচ্ছে।
কথা না বলেও অনেক কথা
ডিজিটাল যোগাযোগে ইমোজির সবচেয়ে বড় শক্তি হল, এটি আবেগকে স্পষ্ট করে। শুধুমাত্র "ঠিক আছে" লিখলে তার অর্থ একরকম হতে পারে, কিন্তু "ঠিক আছে 😊" বা "ঠিক আছে 👍" লিখলে সেই বার্তার অনুভূতি সম্পূর্ণ বদলে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখোমুখি কথোপকথনে যেমন মুখের অভিব্যক্তি, চোখের ভাষা বা কণ্ঠস্বর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, অনলাইন কথোপকথনে সেই শূন্যস্থান অনেকটাই পূরণ করে ইমোজি। তাই ভুল বোঝাবুঝি কমাতেও এর ভূমিকা রয়েছে।
প্রজন্ম বদলেছে, বদলেছে ভাষাও
আজকের প্রজন্মের কাছে ইমোজি শুধু অনুভূতির প্রতীক নয়, অনেক ক্ষেত্রেই এটি একটি স্বতন্ত্র ভাষা। কখনও একটি 😂 বোঝায় প্রবল হাসি, আবার 💀 ইমোজি অনেক তরুণ-তরুণীর কাছে "হাসতে হাসতে মরে যাওয়া"র রসিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। একই ইমোজির অর্থ সময়ের সঙ্গে এবং প্রজন্মভেদে বদলাচ্ছে।
ডিজিটাল সংস্কৃতি নিয়ে গবেষকদের মতে, ইমোজির এই পরিবর্তনশীল ব্যবহারই তাকে একটি জীবন্ত ভাষার বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। নতুন প্রজন্ম নিজেদের সামাজিক পরিচয়ও অনেক সময় ইমোজির মাধ্যমেই প্রকাশ করছে।
কোন ইমোজি সবচেয়ে জনপ্রিয়?
বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ইমোজির তালিকায় এখনও রয়েছে 😂 (Face with Tears of Joy)। এছাড়াও ❤️, 👍, 😍, 😭, 😊 এবং 🤣-এর ব্যবহারও অত্যন্ত জনপ্রিয়। ব্যক্তিগত চ্যাট থেকে অফিসের বার্তা, এমনকি কর্পোরেট বিপণনেও এখন ইমোজির ব্যবহার নিয়মিত।
শুধু মজা নয়, ব্যবসার হাতিয়ারও
ইমোজি এখন আর শুধুই বন্ধুর সঙ্গে আড্ডার অংশ নয়। বড় বড় সংস্থা বিজ্ঞাপন, গ্রাহক পরিষেবা, বিপণন এবং ব্র্যান্ডিংয়েও ইমোজি ব্যবহার করছে। একটি সঠিক ইমোজি অনেক সময় দীর্ঘ বাক্যের চেয়েও দ্রুত গ্রাহকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক ছবি শব্দের তুলনায় দ্রুত গ্রহণ করে। সেই কারণেই ডিজিটাল যোগাযোগে ইমোজি এত দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে।
তবে বিতর্কও কম নয়
ইমোজির ব্যবহার যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে বিভ্রান্তির সম্ভাবনাও। একই ইমোজি বিভিন্ন মোবাইল অপারেটিং সিস্টেমে কিছুটা ভিন্নভাবে দেখা যায়। আবার একই প্রতীকের অর্থও ব্যক্তি বা সংস্কৃতি অনুযায়ী আলাদা হতে পারে। ফলে অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝিও তৈরি হয়। এই কারণেই ইমোজির মান একীভূত করতে ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম নিয়মিত নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করে।
ডিজিটাল যুগের নতুন বর্ণমালা
চিঠির যুগ থেকে মেসেজের যুগ, আর এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সময়—যোগাযোগের ভাষা প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। সেই পরিবর্তনের অন্যতম বড় প্রতীক ইমোজি। একটি ছোট্ট ছবি কখনও হাসায়, কখনও কাঁদায়, কখনও আবার হাজার শব্দের সমান অনুভূতি প্রকাশ করে।
বিশ্ব ইমোজি দিবসে তাই প্রশ্ন একটাই, শব্দের যুগ কি শেষ? সম্ভবত নয়। তবে এটুকু নিশ্চিত, ডিজিটাল দুনিয়ার অভিধানে ইমোজি এখন আর অতিথি নয়, স্থায়ী বাসিন্দা।