নিউজ ডেস্ক: আজ থেকে বহুকাল আগের কথা। হিন্দু সমাজে গৃহদেবী হিসেবে কালীমাতার পুজোর প্রচলন তখনও শুরু হয়নি। করালমূর্তি, হাতে খড়্গ ও সদ্যছিন্ন মুণ্ড, নরমুণ্ডমালায় ভূষিতা ভয়ালদর্শন এই দেবী সেই যুগে লোকসমাজ থেকে দূরে শ্মশান কিংবা অরণ্যের অন্তরালে তান্ত্রিক ও ডাকাতদের দ্বারাই পূজিতা হতেন। বর্তমান সময় থেকে প্রায় ৫০০-৬০০ বছর আগে হুগলি জেলা তথা সমগ্র বাংলায় কুখ্যাত ডাকাতদের সঙ্গে কালীর নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ছিল। যেমন ডুমুরদহের বুনো কালীমন্দিরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ডুমুরদহের বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে বিশে ডাকাতের নাম, তেমনই সিঙ্গুরের পুরুষোত্তমপুরে শতাব্দীপ্রাচীন ডাকাত কালীমন্দিরের সঙ্গে যুক্ত সেই সময়ের হাড়হিম করা গগন ডাকাতের কাহিনি। ডাকাত কালীমন্দিরের সন্ধানে গঙ্গার পশ্চিম তীর বরাবর ডুমুরদহ থেকে আরও কিছুটা দক্ষিণে, প্রায় ৫০০ বছর পিছিয়ে গেলে পৌঁছে যাওয়া যায় রঘু ডাকাত ও বুধো ডাকাতের স্মৃতিবিজড়িত ত্রিবেণীর বাসুদেবপুরের ডাকাত কালীমন্দিরে।
যে সাতটি গ্রাম নিয়ে সপ্তগ্রাম, অর্থাৎ তৎকালীন যুগের ‘সাতগ্রাম’ গড়ে উঠেছিল, তার অন্যতম ছিল বাসুদেবপুর। হুগলির ত্রিবেণী ঘাট থেকে প্রায় এক কিলোমিটারের মধ্যে দুটি প্রধান রাস্তার সংযোগস্থলের পাশেই একসময় জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই ডাকাত কালীমন্দির। বাংলার প্রাচীন জনশ্রুতি অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে ত্রিবেণীর বাসুদেবপুরের দুই কুখ্যাত ডাকাত ছিলেন রঘু ডাকাত ও বুধো ডাকাত। এই দুই ডাকাতের আরাধ্যা দক্ষিণাকালী মন্দিরটি গম্বুজাকার, এক চূড়াবিশিষ্ট। মন্দিরের সামনেই রয়েছে বিশাল চাতাল। মন্দিরের পিছনে আজও রয়েছে একটি পুকুর। শোনা যায়, ডাকাতির অভিযানে রওনা হওয়ার আগে ডাকাতদল এই পুকুরে স্নান সেরে মায়ের পুজো দিত।
বর্তমানে দক্ষিণাকালী মন্দিরটির বাইরের রূপে সংস্কারের ছোঁয়া লেগেছে। অ্যাসবেস্টস, টাইলস-সহ নানা আধুনিক উপকরণ ব্যবহৃত হলেও বহু শতাব্দীপ্রাচীন পরম্পরাগুলি আজও বজায় রয়েছে। মন্দিরের বর্তমান সেবায়েত সুমন চক্রবর্তীর বাবা কানাইলাল চক্রবর্তীর স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে সেই পুরনো দিনের নানা কাহিনি। তাঁর কথায়, “আজ থেকে ৪০-৫০ বছর আগেও এই স্থান ছিল ঘন জঙ্গলে ভরা, জনবসতিহীন। দুপুর ৩টের পর এই অঞ্চলের ছায়া মাড়ানোও ছিল দুঃস্বপ্নের সামিল। এই ডাকাত কালীমন্দিরে নরবলির রীতি চালু ছিল। বর্তমানে প্রতি অমাবস্যায় ছাগবলি দেওয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে। বিশেষ বিশেষ পুজোর দিনগুলিতে মাকে ল্যাটামাছ পোড়া ভোগ দেওয়া হয়। মাঘ মাসের শুক্লপক্ষে অন্নকূট এবং কার্তিক মাসের দীপাবলি এই মন্দিরের প্রধান উৎসব। সেই উপলক্ষে মন্দিরে কয়েক হাজার মানুষের সমাগম হয়।”
বর্তমান ত্রিবেণীর বাসুদেবপুর গ্রামটি সেই সময়ে ছিল জলাভূমি ও জঙ্গলাকীর্ণ এক দুর্গম অঞ্চল। এই অঞ্চল ছিল সপ্তগ্রাম এলাকার জলদস্যুদের অন্যতম প্রধান আস্তানা। এই জঙ্গলেই ছিল বিখ্যাত রঘু ডাকাতের ভাই জলদস্যু বুধোর ডেরা। ডেরার আশপাশেই ছিল কালীমায়ের একটি মন্দির ও বিগ্রহ। রঘু ডাকাত ও বুধো ডাকাতের পূজিত এই মূর্তি সমাজে ‘রঘু ডাকাতের কালী’ নামেই প্রসিদ্ধ ছিল।
ত্রিবেণী অঞ্চলের প্রচলিত লোকশ্রুতি অনুযায়ী, বাগাটীর জয়পুর নিবাসী ভূষণ ঘোষ ও তাঁর ভাই রঘু ঘোষ প্রায় পাঁচ শতক আগে বর্তমান ডাকাত কালীমন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। এই দুই ভাই এবং তাঁদের ডাকাতদল তৎকালীন সময়ে সমগ্র হুগলি জেলায় ‘রঘু ডাকাতের দল’ নামে মানুষের মনে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। ত্রিবেণীর বাসুদেবপুর-কাঁঠালতলা অঞ্চলের গভীর জঙ্গলে রঘু ডাকাত ও তাঁর দলবলের আস্তানা ছিল। তাঁদের আতঙ্ক সাধারণ মানুষের পাশাপাশি জমিদার, সামন্তপ্রভু এমনকী রাজাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ডাকাতদলের হাতে ধরা পড়ার আশঙ্কায় কোনও মানুষই দিনের বেলায় ওই জলাভূমি ও জঙ্গলাকীর্ণ পথ দিয়ে যাতায়াত করার সাহস করতেন না।
লোকশ্রুতি রয়েছে, ভক্তিভরে বুধো ডাকাত এই মন্দিরে মা দক্ষিণাকালীর এক বিশালাকার, ভয়ালদর্শন মৃন্ময়ী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। জাঁকজমক ও ধুমধামের সঙ্গে তিনি তাঁর আরাধ্যা দেবীকে সিদ্ধেশ্বরী রূপে পুজো করতে শুরু করেন। কথিত আছে, কালীমাকে তুষ্ট করতে মাঘ মাসের শুক্লপক্ষে মন্দির প্রাঙ্গণে নরবলির প্রথাও চালু করেছিলেন তিনি।
পরবর্তীকালে বুধো ডাকাতের জীবনে আসে এক বিরাট আধ্যাত্মিক পরিবর্তন। তিনি ডাকাতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের অধিকাংশই গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে শুরু করেন। এমনকী নিজের উদ্যোগে অর্থসাহায্য ও যৌতুক দিয়ে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থাও করতেন।
একসময় রঘু ও বুধো ডাকাতের প্রভাব, প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার সূর্য অস্তমিত হয়। কালের নিয়মে ডাকাতদলের আরাধ্যা কালীমাতার মাটির মূর্তিটিও ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর এই স্থানে মন্দিরটি একাধিকবার ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণ করা হয়। তবে ১৯৯৮ সালে মন্দিরে ঘটে এক ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনা। দুষ্কৃতীরা মায়ের পরনে থাকা যাবতীয় অলঙ্কার-সহ বহু মূল্যবান পুজোর সামগ্রী লুঠ করে নিয়ে যায়। এমনকী পালানোর আগে ভেঙে দিয়ে যায় শতাব্দীপ্রাচীন মৃন্ময়ী কালীমূর্তিটিও।
বর্তমানে মন্দিরের গর্ভগৃহে যে বিগ্রহটি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, সেটি স্থাপন করেছিলেন চিন্তাহরণ মহারাজ। সিমেন্টের তৈরি দক্ষিণাকালীমায়ের মূর্তিটির উচ্চতা প্রায় সাত ফুট। পরবর্তীকালে ভক্তদের সহযোগিতায় মন্দিরটির সংস্কারও করা হয়।
মন্দিরের সেবায়েত সুমন চক্রবর্তী বংশপরম্পরায় এই মন্দিরে পুজো করে আসছেন। প্রতিদিন নিত্যপুজো হলেও প্রতি অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় আড়ম্বরের সঙ্গে শাক্তমতে দেবীমাতার পুজো করা হয়। তবে ভক্তসমাগম সবচেয়ে বেশি হয় দীপান্বিতা অমাবস্যা এবং মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের কালীপুজোর রাতে।
এখন আর আগের মতো মাঘ মাসের পুজোয় নরবলি হয় না ঠিকই, তবে শাক্তমতে কালী আরাধনার রীতি মেনে আজও এই মন্দির প্রাঙ্গণে চণ্ডীপাঠ সহযোগে বিধি মেনে ছাগবলি দেওয়া হয়। বহু ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে নবরূপে সজ্জিত এই মন্দিরটি হুগলি জেলা তথা সমগ্র বাংলার পর্যটন মানচিত্রে আজও ‘বুধো ডাকাতের কালীবাড়ি’ হিসেবেই পরিচিত।




